কলেজ মানে নতুন জীবন।
আমার নতুন জীবন শুরু হলো। নতুন জীবনে সবকিছুই বোধহয় নতুন নতুন লাগে। মেয়েরা যেহেতু সবকিছুর মাঝে কিছু একটা- তাই কলেজে মেয়েদেরও নতুন লাগতে লাগল।
স্কুলে দেখে এসেছি… ছেলে আর মেয়ের মধ্যে কেমন একটা লুকোচুরি ব্যাপার থাকে। আর কলেজে গিয়ে দেখি এর বিপরীত দৃশ্য। ক্যাম্পাসের এখানে ওখানে ছেলে-মেয়ে একসাথে বসে থাকে… ছেলেটা কিছু একটা বলে আর মেয়েটা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খায়। আমার অবশ্য এরকম কিছু হয় না। শুকনো মুখে ক্যাম্পাসে ঘুরোঘুরি করি আর অবাক হয়ে লক্ষ্য করি- আমি এবং আমার মত কয়েকজন বাদে সব ছেলের সাথে এক বা একাধিক মেয়ে হাঁটছে কিংবা বসে আছে কিংবা অন্যকিছু করছে। সেই ঐতিহাসিক কথাটা বড় বেশি বাস্তব মনে হল- যার হয় না… তার স্কুলে হয় না… কলেজে হয় না… এমন কী ইউনিভার্সিটিতেও হয় না!
কলেজে নতুন জীবনের কিছুটা দেখা মিললেও- বাসায় আগের জীবনই চলে লাগল। বিকেল পাঁচটার এক মিনিট পরে বাসায় আসলে মা চিৎকার করে উঠেন…
- সারাদিন বাইরে কী করা হয়?
মা রেগে গেলে… তুই তুমি না করে বলে… ভাববাচ্যে কথা বলে।
আমি ম্যান ম্যান করে বলার চেষ্টা করি…
- এখন তো কলেজে উঠেছি!
মা’র চিৎকার চারগুণ হয়ে যায়…
- আগে ইউনিভার্সিটি আসুক। তখন দেখা যাবে!
আমি মনে মনে বিশাল দীর্ঘশ্বাস ফেলি। আগে শুনতে হত… কলেজে ভর্তি হও, তারপর দেখা যাবে। ইউনিভার্সিটিতে উঠলে মা কী বলবে আমি মনে মনে ঠিক করে ফেলি…
- আগে বউ আসুক। তারপর দেখা যাবে!
এরই মধ্যে আমরা নতুন বাসায় আসলাম। নতুন বাসায় আসলে আমি যে কাজটা প্রথমে করি- আশেপাশের বাসায় সুন্দর কোন মেয়ে আছে কিনা খুঁজে দেখি। এবারও যথারীতি অনুসন্ধান পর্ব শুরু করলাম। আশেপাশে কয়েকটা মেয়ে দেখলেও… তেমন একটা খুশি হতে পারলাম না। সমুদ্র দেখে আসার পর পুকুর ভালো লাগে না। আমার হয়েছে ঐ অবস্থা। কলেজে হাজার হাজার সুন্দরী বালিকা দেখার পর- বাড়ির আশেপাশের এসব মেয়েকে কী তেমন একটা ভালো লাগে।
বাসার গলির মুখে ছিল সাবের ভাইয়ের ক্যাসেটের দোকান। সব ক্যাসেট কেনার টাকা আমার নেই। তাই ভালো ভালো গানগুলো সাবের ভাইয়ের দোকান থেকে রেকর্ড করে নিয়ে আসতাম।
সেদিন সাবের ভাইয়ের দোকানে একটা ক্যাসেট আনতে গিয়েছি। হঠাৎ একটা মেয়ে এসে ঢুকল। আমি সবকিছু ভুলে গিয়ে আড়চোখে মেয়েটার দিকে তাকালাম। আমার চেয়ে কয়েক বছরের ছোট হবে। ঢুকেই পট পট করে সাবের ভাইকে বলল…
- ভাইয়া। আমার ক্যাসেটটা রেকর্ড করা হয়েছে?
- হ্যাঁ।
- গুড। আজ যদি বলতে হয় নাই… তাইলে একটা গাঁট্টা দিতাম। হি হি হি…
অদ্ভুত হাসিটা শুনেই আমার কেমন যেন লাগল! এত মিষ্টি করে হাসার কোন মানে হয়? মেয়েটা কথা বলেই যাচ্ছে…
- শোন। নতুন আরেকটা ক্যাসেট রেকর্ডিং করে দিবা।
সাবের ভাই বলল…
- কী গান?
- এইত্ত হিন্দী।
সাথে সাথে আমি বমি করা টাইপ একটা শব্দ করে বললাম…
- ইস্! হিন্দী গান মানুষ শোনে?
মেয়েটা চোখ বড় বড় করে ফেলল। আমার হাতের ক্যাসেটটার দিকে তাকিয়ে- মুখ ভেংচে বলল…
- হুঁ। হিন্দী গান মানুষ শোনে না। আর ঐ ভেড়ার চিৎকারের গানগুলা ছাগল শোনে।
আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলাম… মেয়েটা আমার হাতের ক্যাসেটটা নিয়ে নীচে ফেলে দিয়েছে। আমার রাগ হল খুব।
- এটা কী করলা?
- খুব ভালো করেছি… হি হি হি…
সাবের ভাইয়ের কাছ থেকে জানতে পারলাম- মেয়েটার নাম ঐশী। ঐশী জনৈক দত্ত সাহেবের মেয়ে।
ঐশী নামটা- ঐশীর বড় বড় চোখ দুইটা- ঐশীর রাগী রাগী অথচ ”কেমন যেন” কণ্ঠটা আমার মাথার চারপাশে ঘুরঘুর করতে লাগল। রাতের বেলা খাবার টেবিলে আব্বুকে জিজ্ঞেস করলাম…
- আব্বু, আমাদের পাড়ায় হিন্দু কেউ থাকে?
নতুন জায়গায় আসলে- আব্বু দুইদিনের মধ্যেই আশেপাশের সবার খোঁজখবর নিয়ে ফেলে। আব্বু যখন বলল… দত্ত সাহেব নামের একজন আছেন… আমার মনে হাজার হাজার স্বপ্নের দল খেলা শুরু করে দিল। ঐশী! কী অদ্ভুত নাম!
ঐশীদের বাড়ি একতলা। আমি প্রায় ওর বাড়ির সামনে ঘুরঘুর করতে লাগলাম। ঠিক করেছি- দেখা হলেই ভাব দেখাব- সেদিন আমার ক্যাসেটটা ওভাবে ছুঁড়ে ফেলে দিল কেন? একদিন বিকেলে ঐশীদের বাড়ির সামনে ঘুরঘুর করছি। হঠাৎ ঐশীর কণ্ঠ শুনলাম… সেই কেমন কেমন লাগা কন্ঠটা। শুনতে আমার একটুও ভুল হল না। গলির একপাশে ঐশী দাঁড়িয়ে আছে।
- ভাইয়া… শুনে যান।
আমি বোকার মত মেয়েটার কাছ গেলাম…
- কী?
- সরি।
- সরি কেন?
- ঐদিন বেয়াদবের মত আপনার হাত থেকে ক্যাসেট ফেলে দিলাম- তাই।
মেয়েদের সামনে গেলে আমি ঠিকমত কথা বলতে পারি না। রাঙা রোদ্দুর মাখা বিকেলে- রোদ্দুরময়ী ঐশীর সাথে তো নয়ই।
- তবে আপনারও দোষ আছে। আপনি হিন্দী গানকে পচা বললেন কেন?
আমি বোকার মত বলে বসলাম…
- আচ্ছা। আর বলব না।
আমার কথা শুনে ঐশী হি হি করে হেসে উঠল। আমি ওর বড় বড় চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে রইলাম। মাথার ওপর হাজার হাজার কাকের সাথে একটা অপরিচিত পাখি। চিরচেনা এই বিকেলের মাঝে ঐশীকে আমার ঐ অপরিচিত পাখিটার মতন লাগল। খুব বেশি অপরিচিত।
একদিন বিকেলে ঐশী আমার হাতে একটা ক্যাসেট ধরিয়ে দিল। হাসন রাজার গান। চোখ বড় বড় করে বলল…
- হাসান রাজার গান আমার খুব ভালো লাগে!
আমি বললাম…
- হিন্দী গানের চেয়ে বেশি?
ঐশী আমার কাঁধে একটা ধাক্কা দিল।
- যাঃ আমি কী অত বেশি হিন্দী গান শুনি নাকি?
বাসায় এসে হাসন রাজার গান শুনতে লাগলাম। আম্মু এসে বলে…
- কীরে চিল্লাচিল্লি বাদ দিয়ে… হঠাৎ হাসন রাজার গান শোনা শুরু করলি যে!
আমি মার দিকে তাকিয়ে বলি…
- হাসন রাজার গান আমার খুব ভালো লাগে!
এরপর ঐশীর সাথে আমার নিয়মিত দেখা- নিয়মিত কথা হতে লাগল। আমি ঐশীকে হিন্দী গানের কথা বলে রাগিয়ে দিই- ঐশী চোখ বড় বড় করে ফেলে। আমার তাকিয়ে থাকতে বড় ভালো লাগে! বিকেল বেলা মাত্র একঘণ্টার জন্য আমরা রিকশা ভ্রমণে বের হয়। দুই টাকা ভাড়া কমানোর জন্য আমি যখন রিকশাওয়ালার সাথে কথার যুদ্ধ শুরু করি ঐশী চোখ বড় বড় করে বলে…
- দুই টাকা বেশি দিলে কী হয়? এমন করছেন কেন?
আমরা শিশুপার্কে যাই। গুহার ভেতরে বানানো ভূত দেখে ঐশী আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঐশীর চুলের ঘ্রাণ আমার শরীরের ভেতর- মনের ভেতর ধাক্কা খায়।
রাত বারোটা ত্রিশ।
আমি ঐশীদের বাড়ির দেয়াল টপকালাম। বুকের ভেতর কিছু একটার শব্দ হচ্ছে। ঐশীর ঘরের জানালায় গিয়ে দেখি- ওইশী দাঁড়িয়ে আছে। বলল…
- আসতে এতক্ষণ লাগে! অনুষ্ঠান বারোটায় শুরু হয়ে যাওয়ার কথা।
আমি বললাম…
- আব্বু আম্মু ঘুমিয়েছে কীনা শিওর না হয়ে আসা যায়!
- হুঁ। চলেন।
ঐশী হাসে! আমি বলি…
- তুমি আমাকে আপনি করে বল কেন?
ঐশী চোখ বড় বড় করে বলে…
- আপনি আমার চেয়ে কত বড়। একটা বুড়াকে আপনি করে বলব না তো কী করে বলব… হি হি হি…
আমরা হেঁটে শিল্পকলা একাডেমীতে গেলাম। ঐশী আমার হাত ধরে হাঁটে। আমার মন থেকে ভয় উধাও হয়ে যায়। এমন গভীর রাতে- ঐশীর হাত ধরে আমার অনন্তকাল হাঁটতে ইচ্ছে হয়। দূর থেকে কোন কুকুর ঢেকে উঠলে- ঐশী আমার হাত চেপে ধরে…
- ভাইয়া। আমার ভয় করছে!
সেদিন রাতে ঐশীর পাশে বসে জীবনে প্রথম মঞ্চ নাটক দেখলাম। নাটকের নাম বিয়ে বিড়ম্বনা। স্টেজে বিয়ে দেখে ঐশী আমার কানের কাছে বলে…
- এই…আমাদেরও একদিন এরকম বিয়ে হবে… না?
আমি ঐশীর নিঃশ্বাসের ঘ্রাণ শুনতে পাই। আমি ঐশীর ভালোবাসার ঘ্রাণ শুনতে পাই।
ঐশীর সাথে আমার বিয়ে হয় নি…।
আমার ফার্স্ট ইয়ার ফাইনালের কিছুদিন পর- ঐশী আর ওর আব্বু আম্মু ঢাকায় চলে যায়। ঐশীর এসএসসি পরীক্ষা শেষ। ঢাকার কলেজে ভর্তি হবে। যাওয়ার আগের দিন ঐশীর বাসার সামনে আমি একঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিলাম। অনেকক্ষণ পর ঐশী আমার কাছে আসল। বড় বড় চোখদুটি জলে ভরা। ঐশী আমাকে প্রথম এবং শেষবার তুমি করে বলল…
- তোমার জন্য আমার অনেক মন খারাপ হবে।
আমি ঐশীর চুলে হাত বুলিয়ে দিলাম। পরিচিত বিকেলটায় সেই মেয়েটাকে আমার একটুও অপরিচিত লাগল না।
হঠাৎ ঐশী আমার বুকে ঝাপিয়ে পড়ল…
- আমার আব্বুকে বল না! ঢাকায় গেলে আমি কাঁদতে কাঁদতে পাগল হয়ে যাব।
আমি কিছু বললাম না। আমি জানি- পৃথিবীর সব ঐশীরা এভাবেই চলে যায়!
তুমি তো শালা লুইচ্ছা হয়ে গেছ
a real লুইচ্ছা
হুম……