প্রায় শেষ দৃশ্যঃ
গাজীপুর টু ঢাকা। বলাকা পরিবহণ। আমি অত্যন্ত কৌশলে- আমার মোবাইল সেট টা প্যান্টের পকেট থেকে হালকা করে বের করে রেখেছি। উদ্দেশ্য একটাই। ভীড়ের মাঝে কোন দুষ্টু লোক সেটা হাত করে নিবে। কিন্তু শালার পৃথিবীটাই জানি কেমন কেমন। যা জোর করে দূরে ঠেলে দিতে চাই- সেটা কাছেই থেকে যায়।
শুরুঃ
ইন্টার পরীক্ষার পর ঢাকায় আসলাম ভর্তি কোচিং করার জন্য। যেদিকে তাকাই দেখি সবার কাছে মোবাইল সেট। সুতরাং, সামান্য একটা মোবাইল সেট না থাকায় কিছুটা হতাশ হলাম। সব-থেকে ভয়ংকর ঘটনাটা ঘটল সানরাইজ কোচিং সেন্টারে। একদিন ক্লাসে এক মেয়ের সাথে বেশ আলাপ জমিয়ে দিলাম। ক্লাস থেকে বের হয়ে মেয়েটা বলল।
- এই। তোমার নাম্বারটা দাও তো।
আমি বিশাল এক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে- দুঃখী দুঃখী মুখে একটু খানি বললাম।
- আর বলো না। সেট চুরি হয়ে গেছে।
সেদিনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম- একটা মোবাইল সেট কিনতেই হবে। অনেক কষ্টে আব্বুকে রাজী করালাম।
এভাবেই আমার জীবনের প্রথম মোবাইল সেট কেনা হল। Siemens CF62। ফোল্ডিং সেট। খুব যত্নের সাথে মোবাইলের খাপটা লাগাতে লাগলাম। কেউ একটু জোরে সেট নাড়াচাড়া করলেই বলি- এতো গুঁতাগুতি করলে নষ্ট হয়ে যাবে তো।
তিন মাস পরঃ
ডিজুসের ঐতিহাসিক অফার- রাতে ফ্রি কলের বদৌলতে এক মেয়ের সাথে গল্প করছি। হঠাৎ করে গাধার বাচ্চা মোবাইলটা বন্ধ হয়ে গেল। একটু আগে ফুল চার্জ ছিল। মোবাইল আবার অন করলাম। ওপাশের বালিকাকে বললাম।
- সরি।
সরি বলা মাত্র শেষ হয়েছে- বালিকা কিছু একটা বলতে যাবে- এমন সময় আবার ফুটুস।
মোবাইল অন করে দেখি মেসেজ এসেছে।
” তুমি খুব পচা। বার বার লাইন কেটে দাও। কয়টা মেয়ের সাথে কথা বল?”
মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল।
ওয়ারেন্টি কার্ড হারিয়ে গেছে। মোবাইলের ব্যাটারী কিনলাম। লাভের ওপর লাভ হল- এখন আরো তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে যায়। আব্বুকে বলতেও পারছি না- আর একটা সেট লাগবে। সুতরাং আমাদের দুজনের একসাথে পথ-চলা চলতে লাগল। আমি এবং Siemens CF62।
৪ সেপ্টেম্বর- ২০০৬-
কক্সবাজার গিয়েছি। রাত আটটার দিকে পকেটে হাত দিয়ে দেখি মোবাইল নেই। মনে মনে কিছুটা খুশি হলেও আব্বূর বকার ভয়ে বুকটা ধ্বক করে উঠল। আবার হালকা পাতলা মায়া ও হল। কিছুক্ষণ আগে বীচে বসে ছিলাম। নিশ্চয় পকেট থেকে পড়ে গিয়েছে। খুঁজতে গেলাম। অনেকক্ষণ ধরে খুঁজেও পাচ্ছি না। তখন সমুদ্রে জোয়ার চলছে।
হঠাৎ চাঁদের ক্ষীণ আলোয় দেখলাম- ছোট্ট একটা ঢেউয়ের সাথে আমার সিমেন্স মোবাইল সেট। কী অসাধারণ একটা দৃশ্য! নায়ক সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে হারিয়ে যাওয়া নায়িকার কথা ভাবছে- এমন সময় সমুদ্র নায়িকাকে ফিরিয়ে দিয়েছে।
সেট ভিজে গেছে। বোকার মত চেষ্টা করলাম অন করতে। ভ ভ একটা শব্দ ছাড়া জীবনের কোন চিহ্নই নেই। ব্যাটারী খুলে দেখি সমুদ্রের পানি আর সৈকতের বালি মিশে একাকার হয়ে গেছে। নতুন ব্যাটারী লাগালাম। মোবাইল অন হল। পরীক্ষা করার জন্য সারারাত একটা মেয়ের সঙ্গে কথা বললাম। আর অবাক হয়ে দেখলাম এক বারের জন্যও ফোন অফ হয় নি। শালা কি পুরাপুরি ঠিক হয়ে গেল নাকি? বুঝলাম- বেচারী সিমেন্স আমার কাছে থাকতে চায়।
দুই মাস পরঃ
আমি আর ইমন নীলক্ষেত থেকে বই কিনে রিক্সা করে বুয়েট যাচ্ছি। হঠাৎ চিৎকার শুনে পেছনে তাকালাম। দেখি মধ্যবয়স্ক এক লোক লুঙ্গি তুলে দৌঁড়াচ্ছে আর আমাদের দিকে ছুটে আসছে।
- ভাই। আপনাগো মোবাইল। আপনাগো মোবাইল।
লোকটার হাতে আমার Siemens CF62।
লোকটার দৌড় দেখে মনে হলো- আমার হাতে মোবাইলটা তুলে দিতে না পারলে তার মানবজন্ম হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়বে!
তারপরঃ
এরপর থেকে মোবাইলটা প্রচন্ড ডিস্টার্ব দেওয়া শুরু করল। কিন্তু কেন জানি বেচারাকে ছুঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে না। মায়া পড়ে গেছে। ঠিক করলাম- সরাসরি না করে কৌশলে দূরে সরিয়ে দিতে হবে। অনেক উদ্যোগ নিলাম। হলে বের হওয়ার সময় রুমে তালা দিই না এবং মোবাইলটা বিছানার উপর রেখে যাই। যাতে কেউ চুরি করে নিয়ে যায়। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। Siemens CF62 পণ করেছে আমার কাছে থাকবে সারা জীবন। ইস, কোন মেয়ে যদি এরকম হতো!
শেষ দৃশ্যঃ
তিন মাস আগের কথা। মোবাইল চার্জে দিয়েছি। হঠাৎ দম করে একটা শব্দ হল। মোবাইল অন করার চেষ্টা করলাম। কিছুই হল না। Siemens CF62′এর কালো পর্দা। আমার একটু খারাপ লাগল। মনে হল সে আমাকে বলছে-
- তোমাকে আর কষ্ট করতে হল না। আমি নিজেই বিদায় নিলাম।
[[এই লেখার মাধ্যমে বেচারাকে আনুষ্ঠানিক বিদায় জানাচ্ছি]]