১.
সাজিয়া যখন খামে করে আমার হাতে টাকাটা তুলে দিল এবং মুখ বাঁকা করে বলল…
- গুনে দেখেন স্যার! টাকা ঠিক আছে নাকি?
আমি খুব লজ্জা পেলাম। এতদিন সাজিয়ার সাথে আমার কেবল শিক্ষক- ছাত্রীর সম্পর্ক ছিল। কিন্তু কয়েকদিন আগে সেই সম্পর্কটা অন্যরূপ নিয়েছে। প্রত্যেকবার মাসের শেষে টাকা পেলেই আমি গুনে দেখি কিন্তু এখন তো আর সেটা করা যায় না। বরং আমি লজ্জা পাওয়ার ভান করে বললাম …
- টাকার কী দরকার ছিল?
সাজিয়া গলা নীচু করে বলল…
- মনে আছে তো? কাল কিন্তু আমরা ডেট করছি!
‘ডেট’ শব্দটা শুনে কিছুটা ধাক্কা খেলাম। ডেট মানে আমার কাছে ইংরেজী ছবির কিছু দৃশ্য। নিজের জীবনে এটা ঘটার স্বপ্নে আমি হঠাৎ করে বিভোর হয়ে গেলাম। আগামীকালের নানা দৃশ্যের কথা কল্পনা করে আমার চোখ চকচক করে উঠল। হঠাৎ সাজিয়ার কণ্ঠ শুনলাম…
- সাইন স্কয়ার থিটা প্লাস কস স্কয়ার থিটা…
পাশ ফিরে দেখি দরজার সামনে সাজিয়া’র মা দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে হাসলেন একটু…
- কী বাবা? কেমন চলছে তোমার ছাত্রীর পড়াশোনা?
আমি গাম্ভীর্যের সাথে মাথা নাড়লাম… যার অর্থ ভালোই। সাজিয়ার মা বললেন…
- কোন সমস্যা হলে বলতে লজ্জা করবে না কিন্তু!
আমি দাঁত বের করে বললাম…
- আন্টি…না না লজ্জা কীসের?
২.
সাজিয়া কলাবাগানের মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি সাজিয়ার কাছে গিয়ে হাসলাম। বললাম…
- কেমন আছ?
আমাকে সম্পূর্ণ হতভম্ব করে দিয়ে সাজিয়া বলে উঠল…
- আসতে এতক্ষণ লাগে? প্রচন্ড খিদা পেয়েছে। চল কিছু খাই!
আমি অভ্যাসের কারণে ‘মদীনা হোটেল’ টাইপ নামের একটা হোটেলের সামনে সাজিয়াকে নিয়ে গেলাম। সাজিয়া মুখ বাঁকা করে বলল…
- তুমি এসব পচা হোটেলে খাও? ছি…
এরপর সাজিয়া আমাকে ‘ভূত’ নামক একটা হোটেলে নিয়ে গেল। ও’র রাইস খেতে ইচ্ছে করছে না। বার্গার… পিৎজা কীসব যেন খেল।
পাঁচশ তিরিশ টাকা মানিব্যাগ থেকে বের করতে করতে আমি সাজিয়ার দিকে তাকিয়ে শুকনো মুখে হাসলাম।
এরপর আমরা ট্যাক্সি ক্যাবে বেড়ী বাঁধের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। সাজিয়া’র ধারণা ট্যাক্সি ক্যাবে যাওয়াটা অনেক বেশি রোমাণ্টিক হবে। ও আমার হাত ধরে ধরে যাবে। আমি নীচু গলায় প্রতবাদ করার চেষ্টা করেছিলাম… লাভ হয় নি। এর ফল স্বরূপ সাজিয়া আর আমি এই মুহুর্তে ট্যাক্সী ক্যাবে বসে আছি। সাজিয়া আমার হাত ধরে আছে আর কেমন করে যেন হাসছে। আমি টাকা পয়সা’র চিন্তা ভুলে গিয়ে পাশে বসা বালিকা’র দিকে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করলাম। সাজিয়া বলছে…
- আমরা কিন্তু আশুলিয়ায় গিয়ে নৌকায় চড়ব। ঠিক আছে?
আশুলিয়ায় নৌকোয় নাকি প্রায় সময় ঘটনা ঘটে। আমার কিছুটা নার্ভাস লাগল।
ট্যাক্সীর ভাড়া আসল আড়াইশ টাকা। টাকা হাতে পেয়ে ড্রাইভার বলল…
- স্যার। আর বিশটা টাকা বাড়াইয়া দ্যান না।
আমার ইচ্ছা করল ব্যাটার মাথায় জোরে একটা থাবড়া দিই।
আশুলিয়ায় নৌকোয় ঘুরলাম আমরা। বিকেলের দিকে সাজিয়া বলল…
- লাঞ্চ করবা না? তুমি তখনো কিছু খাও নাই!
আমি ম্যান ম্যান করে বললাম…
- এখন তো বিকেল পাঁচটা। এই সময় মানুষ লাঞ্চ করে?
সাজিয়া আমার হাত ধরে টানল।
- না খেয়ে খেয়ে তো শরীরের এই অবস্থা করেছ! চল…
আমি জীবনে প্রথমবারের মত পাঁচশ আশি টাকা দিয়ে লাঞ্চ করলাম। সাজিয়াও করল। খাওয়া শেষ করে সাজিয়া বলল…
- আজ দিনটা কী সুইট ছিল! না?
আমি শুকনো মুখে বললাম…
-হ্যাঁ।
- চল। বাসায় ফিরতে হবে।
- হুঁ। তুমি একা একা যেতে পারবা না? আমি গাজীপুর চলে যাই?
সাজিয়া কন্ঠটা কান্না কান্না করে ফেলল।
- উঁ। একা একা যেতে আমার ভয় লাগবে! আমাকে দিয়ে এসো না!
আমি সাজিয়াকে ওর বাসার গলির সামনে দিয়ে আসলাম। মাঝখানে সাজিয়া বসুন্ধরা সিটি থেকে কয়েকটা হিন্দী মুভির ডিভিডি কিনেছে।
৩.
সাজিয়ার বাসার সামনে থেকে হেঁটে হেঁটে আমি কলাবাগানের মোড়ে আসলাম। পাশেই তুহিনের বাসা। আমি তুহিনকে মোবাইলে ফোন করলাম।
- দোস্ত! তিরিশটা টাকা নিয়ে আয় না? আমি কলাবাগানের মোড়ে আছি।
- ক্যান কী হইছে?
আমি একটা বিরাট দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
- আর বলিস না। ঢাকায় আসার সময় দুই হাজার টাকা নিয়ে আসছিলাম। সব ছিনতাই হয়ে গেছে!
হাহ্ হাহ্ হা…
দারুন..
হা হা হা