ক্লাস টেনের পর থেকে এসএসসি পরীক্ষার আগ পর্যন্ত প্রায় চার মাস আমার জীবন মেয়ে-শূণ্য হয়ে থাকল। টেস্ট পরীক্ষার পরপরই স্কুল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে… ক্লাসরুমে বসে বসে যে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাকব সে উপায়ও নেই।
আমার আসন্ন এসএসসি পরীক্ষা উপলক্ষ্যে আম্মু বাসার ডিশ কানেকশন কাটিয়ে দিয়েছেন। তাই মাঝে মধ্যে বিটিভির নাটক দেখি… আর হতাশা নিয়ে অভিনেত্রী এবং মডেল কন্যাদের দিকে চেয়ে থাকি।
এসএসসি’র প্রথম পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময়… ভয়ে সবার বুক কাঁপে। কিন্তু আমার সকল উৎকন্ঠা ছিল…পরীক্ষার হলে আমার পাশে কোন মেয়ের সীট পড়বে কিনা- এ নিয়ে। পরীক্ষার আগের রাতে স্বপ্ন দেখতে লাগলাম- একটা অসম্ভব সুন্দর মেয়ে আমার পাশে বসেছে। আর মাঝে মধ্যে করুণ মুখ করে আমাকে জিজ্ঞেস করছে…
- এই প্রশ্নটার উত্তর কী যেন!
আর আমি বীরের মত একের পর এক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাচ্ছি। এরপর পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে…সুন্দর মেয়েটা আমাকে লাজুক ভঙ্গিতে ধন্যবাদ দিল এবং…
এসএসসি পরীক্ষায় আমার পাশে মাস্তান টাইপ একটা ছেলে বসেছিল। কিছুক্ষণ পরপর প্রশ্ন করে… আমি ‘জানি না’ বললে…এমন একটা ভাব নিয়ে আমার দিকে তাকাত… যেন কোন প্রশ্নের উত্তর না জানাটা ভয়ংকর কোন অপরাধ এবং এর শাস্তি স্বরুপ সে আমাকে জীবিত কবর দিয়ে ফেলবে। সেই মাস্তান টাইপ ছেলে অগ্নিদৃষ্টির সামনে- এসএসসির পর কোচিংএ যাওয়ার নাম করে একটা কিছু যোগাড় করতে পারব- এই আশা নিয়ে পরীক্ষা শেষ হল।
এসএসসির পর আমার বিশেষ উদ্দেশ্যে কোচিং করা হল না। একদিন মেঝমামা এসে হাজির হলেন এবং আমি আর আমার ছোটবোন নানা বাড়ি ছাতকের উদ্দেশ্যে- পাহাড়িকা এক্সপ্রেসে চড়ে বসলাম।
নানা বাড়িতে আমার দিনকাল বেশ আরামেই কাটছিল। বিকেলে ছোটমামার সাথে… সুরমা নদী জয়ে বের হই… মাঝে মধ্যে মেঝ মামার সাথে নদীর ওপারে…লাফার্জ সিমেন্ট কারখানা দেখতে যাই… নানা বাড়ির পাশে টিলার ওপর গিয়ে বসে থাকি…একেবারে খারাপ না।
নানা বাড়ির পাশের টিলায় একদিন দুপুরে গিয়েছি। দেখি আমার চেয়ে কয়েক বছরের বড় একটা মেয়ে… আপনমনে সিগারেট খাচ্ছে। আমি খুবই অবাক হলাম। একটা মেয়েকে সিগারেট খেতে দেখে।
অনেকদিন পর সুন্দর একটা মেয়ে দেখেছি। তাই আমি তার পাশে গিয়ে বসলাম। মেয়েটা আমার দিকে হেসে বলল…
- কী বাবু। সিগারেট খাবি?
- আমি সিগারেট খাই না।
মেয়েটা হি হি করে হেসে উঠল…
- ও…তুই বুঝি ভালো ছেলে।
- আমাকে তুই করে বলছ যে!
মেয়েটা এমনভাবে হাসা শুরু করল… আমি এইমাত্র পৃথিবীর সবচেয়ে মজার কথাটা বললাম… হাসতে হাসতে বলল…
- তা… কী আপনি করে বলতে হবে? বাবু! আপনার নাম কি?
এই কথাটা বলে মেয়েটা আমার গাল টিপে দিল…লজ্জায় আমার কান লাল হয়ে উঠেছে…
- আমি শিপন। তোমার নাম কি?
- নাদিয়া। না…দি…য়া। বুঝলি বাবু? না…দি…য়া।
মেয়েটার মনে হয় হাসিরোগ আছে…আমার ছোটবোনের মত। হাসতে হাসতে পাগলই হয়ে যাবে- বোধ হয়।
আমি একটা দুঃসাহসী কাজ করে ফেললাম। নাদিয়া আপা’র কাছ থেকে সিগারেটটা নিয়ে একটা টান দিয়ে ফেললাম…আর খুক খুক করে কাশতে লাগলাম। নাদিয়া আপা সাথে সাথে হাসি থামিয়ে দিয়ে আমার কান টেনে ধরল। বলল…
- বেয়াদব ছেলে! সিগারেট খাইলি কেন?
- তুমিও তো সিগারেট খাও। তার মানে তুমি বেয়াদব মেয়ে?
- মুখে মুখে তর্ক করবি না।
এর পরেরদিন আবার ঐ টিলায় নাদিয়া আপার সাথে দেখা হল। নাদিয়া আপা কাঁদছিল। আমি কী করব বুঝতে পারলাম না। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম…
- আপা। কাঁদছ কেন?
নাদিয়া আপা চেঁচিয়ে উঠল…
- আমার ইচ্ছা হচ্ছে কাঁদছি। তোর কোন অসুবিধা আছে?
এই কথার পর আর কিছু বলা যায় না। আমি বোকার মত চুপ করে রইলাম। হঠাৎ আপা কান্না থামিয়ে হাসতে শুরু করল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল…
- ও মা। বাবু’র দেখি চুলও পেকেছে আবার! এদিকে আয় তো… চুল বেছে দিই… পিচ্চিদের পাকা চুল থাকা ভালো না… পাকা চুল থাকবে আমার মত বুড়িদের।
হি হি…
এরপর নানা বাড়ির দিনগুলো আমার কাছে স্বপ্নের মত হয়ে গেল। দুপুরে খাওয়ার পরই আমি টিলায় চলে যাই… নাদিয়া আপা সিগারেট খায়। আমি নাদিয়া আপাকে জিজ্ঞেস করি…
- প্রত্যেক দুপুরেই কি তোমার সিগারেট খাওয়া লাগে?
নাদিয়া আপা বেশ গাম্ভীর্যের সাথে বলে…
- দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর একটা সিগারেট না খেলে ঠিক জমে না। তুই তো বাবু…এইসব বুঝবি না।
আমি নাদিয়া আপার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকি। দুপুরের রোদ্দুর নাদিয়া আপার মুখে এসে পড়ে… সেই রোদ্দুর আমার ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়।
একসময় নাদিয়া আপা আমার পাকা চুল বেছে দেয়। আমাকে সামনে বসিয়ে নাদিয়া আপা বলে…
- এই অল্প বয়সে এত্ত পাকা চুল পাইলি কোত্থেকে বল তো? আবার চশমাও লাগিয়েছে একটা!
নাদিয়া আপা আমার চোখ থেকে চশমা খুলে নিয়ে পরে নেয়। আর বলে…
- বাব্বা! এত্ত পাওয়ার… ডাক্তার দেখাস না?
আমার মনটা কেমন করে!
আমরা সুরমা নদীর পাড়ে গিয়ে বসে থাকি। মাঝে মাঝে নৌকায় চড়ে বসি। নাদিয়া আপা গান শুরু করে… আমার চোখে পানি নেমে আসে।
সেদিনও আমরা নৌকায় ছিলাম। নাদিয়া আপা হঠাৎ আমার হাতটা নিয়ে তার পেটে রাখল। আমি অবাক হয়ে গেলাম… নাদিয়া আপা হেসে বলল…
- কিছু বুঝতে পারছিস?
আমি চুপ করে থাকলাম। নাদিয়া আপা হেসেই চলেছে…নীচু কণ্ঠে বলে…
- আমার বাচ্চা হবে!!! বাচ্চাটার নাম শিপন হলে কেমন হয়? বল তো!!
আমি জানতাম নাদিয়া আপার বিয়ে হয় নি। ওর বয়স আর কত হবে? সতের-আঠারো। বললাম…
- বাচ্চা হবে মানে?
- বোকা। সবাই কি আর তোর মত ভালো মানুষ। কারো সাথে একা একা নৌকায় চড়লে কিংবা টিলায় বসে থাকলে…বাচ্চা হয়ে যায়।
নাদিয়া আপা কেঁদে ফেলে… আমি তার চুলে হাত রাখি…
নাদিয়া আপা কান্নাভেজা ঠোঁটে আমার ঠোঁট চেপে ধরে। আমি চোখের জলের নোনতা স্বাদ পাই। আমার সমস্ত শরীর কেঁপে ওঠে… আমাদের নৌকোটা কেঁপে ওঠে।
- আমাকে ক্ষমা করে দিস…বোকা। এই মুখ আমি আর কখনো কাউকে দেখাতে পারব না।
সুরমা নদীর মাঝখানে…চিৎকার করে আমার বলতে ইচ্ছে করে…নাদিয়া আপা…আমি সারাজীবন তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকব…আমি সারাজীবন তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকব।
আমি বলতে পারি না। নাদিয়া আপা আমার হাত ধরে বলে…
- তুই খুব ভালো ছেলে…শিপন।
নাদিয়া আপার মৃত্যু সংবাদ পাই…দুইদিন পর সন্ধ্যায়। আমার কান্না দেখে…মামা…মামী…সবাই খুব অবাক হয়।
নাদিয়া আপার জানাযায় আমিও ছিলাম।
ওর কবরে আমি মাটি দিয়েছিলাম। আমি মানুষটা মনে হয়…খুব নিষ্ঠুর। ভালোবাসার কারো কবরে যে মানুষ মাটি দিতে পারে…তাকে নিষ্ঠুর ছাড়া আর কী বলা যায়?
* * * * * *
অনেকদিন পর আমার মাথাভর্তি যখন পাকা চুল থাকবে… যখন কেউ আমাকে বাবু বলে ডাকবেনা… তখন আমি ছাতকের সেই টিলায় যাব… টিলার ওপর জমে থাকা সবুজ ঘাস ছুঁয়ে দিয়ে… আমি নাদিয়া আপার কথা লিখব।
excellent
খারাপ লাগলো
http://www.somewhereinblog.net/blog/tajulislamblog
অনেক দিন পর মনটা ভিজে গেল।ঘোলাটে হয়ে উঠল চোখ দুটো।
লেখাটা অনেক ভাল লেগেছে।
এইটা কি সত্য ঘটনা ??
কষ্ট লাগছে……
chomotkar kintu nirmom:(