bokashoka

গোধূলিদা এবং অতিপ্রাকৃত সাইকো রহস্য

In গল্প on মার্চ 27, 2008 at 2:58 pm


[[ ''ধূসর গোধূলি'' নামের কপিরাইট ভঙ্গের জন্য লেখক প্রচণ্ড দুঃখিত ]]
- মহিব তো ভালোই শিখছস খেলা।
কথাটা বলে গোধুলিদা মুখের সিগারেট শেষ না করেই- আরেকটা ধরালেন। এটা তার পুরনো স্বভাব। তাই আমি অবাক না হয়ে দাবা বোর্ডের দিকে মনোযোগ দিলাম। গোধুলিদার মন্ত্রীকে চারপাশ থেকে বন্দী করে ফেলেছি… মনে জয়ের ক্ষীণ একটা আশা দেখা দিয়েছে। কিন্তু আমি ভালো করেই জানি শেষ পর্যন্ত গোধুলিদা কোন না কোন ভাবে জিতে যাবেন।

আমরা বসে আছি- আমাদের পাড়ার ক্লাব ঘরে। বিকেল চারটার মত বাজে। বাইরে পাগলা বৃষ্টি হচ্ছে। আদিবরা কেউই এখনো আসে নি। সবাই আসলেই গোধুলিদা’র গল্প শুনব। গল্প মানে গোধুলিদা’র নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা।

সিগারেটে প্রচণ্ড তৃপ্তির সাথে একটা টান দিয়ে গোধূলিদা বললেন…
- প্রায় পঁচিশ বছর আগের কথা।
গোধুলিদাকে দেখলে বয়স তিরিশের আশে পাশে মনে হয়। যদিও গোধূলিদা’র প্রায় সব ঘটনা একশ দুইশ বছর আগের। ইতোমধ্যেই এ নিয়ে আমরা সবাই অবাক হওয়া ছেড়ে দিয়েছি।
শুধু নাসিমটা বাদে। ব্যাটা জোঁকের মত লেগেই থাকে। মুখটা গম্ভীর করে বলল…
- সত্যি করেন বলেন তো গোধূদা। আপনার আসল বয়স কত?
- সেটার কী আর হিসেব আছে রে গর্দভ… কিছু একটা হবে…
আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে গোধুলি’দা গলা পরিস্কার করার একটা শব্দ করলেন…আমরা সবাই নড়ে চড়ে বসলাম। বৃষ্টির প্রচণ্ড শব্দ কানে আসে। বৃষ্টির গল্পকে পাশে রেখেই গোধুলিদা তার গল্প শুরু করলেন।

তখন আমি থাকি চিটাগাং-এ। একটা ইলেকট্রিক কোম্পানিতে চাকরি করি। বেতন যা পাই…তাতে একা আমার ভালোই চলে যায়। বিকেলে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ললনা দেখি। মাঝে মধ্যে সমুদ্রের পাড়ে বসে বসে হাওয়া খাই। রাতে খাওয়া দাওয়া করে বিছানায় একা একা জম্পেশ একটা ঘুম দিই।
যথারীতি একদিন অফিসে বসে বসে ফাইলের আড়ালে রেখে বই পড়ছি। এমন সময় আমার সহকর্মী রফিক আমাকে বললেন…
- গোধূলি ভাই ঘটনা শুনেছেন?
আমার কিছুটা বিরক্তি লাগল। লোকটা বেশি কথা বলে। তবুও সহকর্মী বলে… মুখে একটা আগ্রহ ফুটিয়ে বললাম…
- জ্বী ভাই শুনেছি… ববিতার নতুন ছবি রিলিজ হয়েছে।
- আরে ভাই। এই ঘটনা না। কক্সবাজারের ঘটনা।
- কক্সবাজারের আবার কী ঘটনা?
- কক্সবাজারে যে মানুষজন গণহারে আত্মহত্যা করা শুরু করেছে- এটা শুনেন নাই?
আমার কিছুটা আগ্রহের সৃষ্টি হলো। আমি হাতের বই বন্ধ করে রফিক সাহেবের দিকে তাকালাম।
- রফিক ভাই… খোলাসা করে বলেন তো।
- আরে… পেপার পত্রিকা পড়েন না নাকি? এটা তো এখন টপ নিউজ। পুলিশ- গোয়েন্দা কোন কুল-কিনারা করতে পারছে না। ভাসা ভাসা শোনা যাচ্ছে… বিদেশ থেকে গোয়েন্দা টোয়েন্দা আসবে। পুরা কক্সবাজারে কোন ট্যুরিস্ট নেই।

এরপরের দুইদিন অফিসে গেলাম না। বাসায় বসে বসে ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করি আর সিগারেট টানি এবং বুঝতে পারি আমাকেই কিছু একটা করতে হবে। ছোটবেলা থেকেই রহস্যময় ব্যাপারে আমার মাথা ভালো খেলত। তাই ছোটখাট একটা ব্যাগ গুছিয়ে একদিন -বাসে কক্সবাজারে উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।

কক্সবাজারে পৌঁছেই বুঝতে পারলাম… অবস্থা অয়াবহ। রাস্তাঘাটে কোন মানুষজন নেই। পুলিশ কিংবা গোয়েন্দার কোন চিহ্ন দেখলাম না।সবাই বোধহয় ঘরে তালা দিয়ে বসে আছে। সব হোটেলেও দেখি তালা ঝুলানো। আমার বুকে সবসময়ই অদম্য সাহস। কিছুক্ষণ রাস্তায় হাঁটলাম… সমুদ্র সৈকতে গিয়ে পা ভেজালাম।

বিকেলের দিকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে আশ্রয় খুঁজলাম। বললাম…
- ভাই… আমি আপনাদের সমস্যার সমাধান করতে এসেছি।
কেউ পাত্তা দিল না। আর কেউ বলল…
- দূর হ… ব্যাটা।

রাত আটটার দিকে সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে একটা বাড়ির দরজায় টোকা দিতে যাব- এমন সময় পেছন থেকে একটা মেয়ে কণ্ঠ বলে উঠল…
- কাকে চান?
মেয়েটার দিকে তাকিয়েই আমি থতমত খেয়ে গেলাম। একটা মানুষের মুখ এত সুন্দর হতে পারে আমার জানা ছিল না। একটা ঢোক গিলে মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলাম…
- আপনি বাইরে কী করেন? সবাই তো ভয়ে ঘরে বসে আছে।
মেয়েটা খিল খিল করে হেসে উঠল। আমি অবাক হলাম…
- হাসছেন যে। আমি কী হাসার মত কোন কথা বলেছি?
মেয়েটা হাসতে হাসতেই বলল…
- হাসছি। কারণ আপনি নিজেও ঘরের বাইরে। নাম কী আপনার?
আমার নাম যে ধূসর গোধূলি এবং আমি যে কক্সবাজারে আত্নহত্যা রহস্যের একটা কিনারা করতে এসেছি… সেটা মেয়েটাকে বললাম। আমার সব কথা শুনে মেয়েটা হেসে বলল…
- ধূসর গোধূলি – এই ধরণের নাম কখনো শুনি নাই।
আমি ‘হে হে’ করে বোকা বোকা একটা হাসি ছাড়লাম। মেয়েতা আমাকে আরো বোকা করে দিয়ে বলল…
- আমার বাড়িতে থাকতে পারেন।
সঙ্গে সঙ্গে আত্নহত্যা রহস্য সম্পর্কিত সকল চিন্তা ভাবনা আমার মাথা থেকে দৌড়ে পালালো এবং সে জায়গায় একটা অতীব সুন্দরী মেয়ের সাথে আসন্ন একই বাড়িতে থাকার আনন্দে মাথাটা ভ ভ করতে লাগল।
- বাড়িতে একা একা থাকি… সংগে কেউ থাকলে ভালো লাগে।
আমার আনন্দেরে মাত্রা বাড়তে বাড়তে বঙ্গোপসাগরের আকার ধারণ করল।

মেয়েটার নাম রেনু। কয়েকদিনের মধ্যেই আবিষ্কার করে ফেললাম… রেনু পাগলাটে টাইপের একটা মেয়ে। দেখা গেল সকালে খুব হাসিখুশি আর বিকেলে মুখটা গোমড়া করে জানালার পাশে এসে বসে আছে। ওর বাবা-মা- আত্নীয় স্বজনের কথা জিজ্ঞেস করতে গেলে… প্রচণ্ড রেগে যায়।

এদিকে অনেক কষ্টে নিজের মধ্যে কিছুটা ইচ্ছা সঞ্চয় করে আমি রহস্য উদঘাটনে বের হই। মানুষজনের সাথে কথা বলার চেষ্টা করি। রাস্তাঘাটে যে দুই একজনের দেখা পাওয়া যায়- তারা আমার কথা না শোনার ভান করে হেঁটে চলে যায়। আমি কী করব কিছুই বুঝে উঠতে পারি না। রেনুকে বলি। রেনু আমার কথা শুনে হাসতে থাকে।
প্রতিদিন রাতে আমরা সমুদ্র পাড়ে গিয়ে হাঁটাহাঁটি করি। সমদ্রের পানিতে পা ডুবিয়ে বসে থাকি। রেনু গান গায়। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি।
এবং একদিন গান শুনতে শুনতে আমি রেনুর হাত ধরে ফেলি। রেনু আমার হাত ছেড়ে দেয় না। বরং আরো শক্ত করে ধরে… বলে।
- তুমি যেদিন চলে যাবে… সেদিন আমি অনেক কাঁদব।
আমার কেমন কেমন লাগে! পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতে আমরা শুধু দুইজন বসে থাকি। সমুদ্রের জলে চাঁদের আলোর প্রতিবিম্ব খুঁজে বেড়াই।

শহরের অবস্থা অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসে। গত দুই সপ্তাহ কোন আত্নহত্যার ঘটনা ঘটে নি। নিজেকে সৌভাগ্যবান একজন মানুষ মনে হয় আমার।

ভয়ংকর ঘটনাটা ঘটল সেদিন। সকালে রেনু বাইরে গিয়েছে…কিছু কেনাকাটা করবে। আমি বিছানায় আলসে ভঙ্গিতে শুয়ে আছি। হঠাৎ বাইরে থেকে রেনুর চিৎকার শুনতে পেলাম। আমি ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দেখি… রেনু পাগলের মত দৌড়াচ্ছে। কাছে এসে আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। রেনুর এমন কান্না দেখে আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। আমি ওর চুলে হাত রাখলাম। রেনু আমাকে বলছে…
- তুমি এখান থেকে চলে যাও… তুমি এখান থেকে চলে যাও।
- আগে একটু শান্ত হও রেনু… তারপর আমাকে সবকিছু বল কী হয়েছে…
রেনু কাঁদছে আর আমাকে বলছে…
- একটু আগে বাজারে দুইজন মানুষ আত্মহত্যা করেছে… তুমি চলে যাও প্লীজ। তুমি মরে গেলে আমি সহ্য করতে পারব না।
- আশ্চর্য… রেনু পাশে থাকতে আমি শুধু শুধু আত্মহত্যা করতে যাব কেন?
- এখানে যারা আছে… সবাই একদিন মারা যাবে।
- তাহলে চল… আমরা দুজনই চলে যাই।
- প্লীজ গোধু… তুমি চলে যাও…প্লীজ।
আমি রেনুকে শুইয়ে দিলাম। বললাম…
- আমার এমনিতে বেঁচে থাকার কিছুই ছিল না… এখন যদি তোমার পাশে মরতে হয়… আমার কিচ্ছু যায় আসে না।
রেনু ভেজা চোখে আমার দিকে তাকাল। আমি রেনুর কপালে একটা আদর এঁকে দিলাম।

পরের রাতে আমরা সমুদ্র ভ্রমণে বের হলাম। আমি আর রেনু সমুদ্রের সামনে হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। রেনু আমাকে গান শোনাল। একসময় রেনু আমার চোখের দিকে তাকাল। সমুদ্র কন্যার কন্ঠে বলল…
- তুমি না থাকলে আমার কী হতো বল তো?
আমি হেসে হাত দিয়ে ওর চুল এলোমেলো করে দিই…
- কিছুই হত না!
রেনু আমার বুকে মাথা রাখে। চাঁদের আলো রেনুর চুলে এসে পড়ে। রেনু আমাকে বলে…
- আচ্ছা তুমি হেঁটে হেঁটে সমুদ্রের মাঝখানে যেতে পারবে?
রেনুর কথা শুনে আমি অবাক হয়ে যাই… এবং লক্ষ্য করি আমার পা দুটো হেঁটে হেঁটে মাঝসমুদ্রে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছে। চাঁদের আলোয় রেনুর মুখে অদ্ভুত একটা হাসি দেখতে পাই আমি। রেনু আবার বলে…
- কী হল? দাঁড়িয়ে আছ কেন? যাও… তাড়াতাড়ি যাও।
আমি রেনুকে ছেড়ে দিয়ে সমুদ্রের জলে পা রাখি। পেছন থেকে রেনুর অপার্থিব হাসি কানে আসে। আমি অনুভূতিশূণ্য একজন মানুষের মত হাঁটি।

হঠাৎ রেনুর চিৎকার আমার কানে আসে। আমি অবাক হয়ে খেয়াল করি- আমি হাঁটু সমান পানিতে দাঁড়িয়ে আছি। আমি রেনুর কাছে ছুটতে থাকি।
এরপর যে ঘটনা ঘটল… তা এখনো আমার চোখের সামনে ভাসে এবং তোরা সেটা বিশ্বাস করবি না।

রেনু একবার চিৎকার করে …
- আমাকে মেরে ফেল… আমাকে সমুদ্রে ডুবিয়ে মেরে ফেল…তাহলে আর কাউকে মরতে হবে না…
আবার অপার্থিব কণ্ঠে বলে ওঠে…
- কী হল? সমুদ্রের মাঝখানে যাও না কেন…
একটা ঘটনাই যেন বারবার ঘটতে লাগল… আমি সমুদ্রের দিকে হাঁটতে শুরু করি… আবার রেনুর চিৎকার শুনে ফিরে আসি… একসময় রেনু আমার বুকে মাথা রাখল… অদ্ভুত একটা কণ্ঠে বলল…
- গোধূ… আমি মরলে আর কাউকে মরতে হবে না… আমি তোমাকে ভালোবাসি… এই সমুদ্রের জনে তুমি আমাকে ডুবিয়ে দাও… আমি যেখানেই যাই না কেন তোমাকে মনে করব…

এতটুকু বলে গোধূলিদা একটা সিগারেট ধরালেন। আমরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে তার দিকে তাকিয়ে আছি। আবিদ বলল…
- গোধূদা এরপর কী হইছে বলেন না…
- আজ না রে।
গোধূদা ভারিক্কী চালে মুখভর্তি করে ধোঁয়া ছেড়ে আমাকে বললেন…
- মিলার নতুন সিডিটা আছে না এখানে…ছাড় তো।
আমি সিডি প্লেয়ার অন করলাম। বৃষ্টি আরো বেড়েছে।
গোধূদা সিগারেটে টান দিতে দিতে মিলা’র সাথে গেয়ে উঠলেন…রূপবান নাচেরে কোমর দুলাইয়া…

All comments are screened for appropriateness. Commenting is a privilege, not a right. Good comments will be cherished, bad comments will be deleted.