bokashoka

ইমনের ফুটবল

In গল্প on মার্চ 27, 2008 at 3:00 pm


”my last salutations are to them…
who knew me imperfect and loved me…”

ঐ দলের গোলকীপার রাজা বেশ একটা ভাব নিয়ে গোল-বার… মানে দুই পাশে দুই স্যাণ্ডল রাখা সীমানার সামনে দাঁড়িয়েছে। আমি দুরু দুরু বুকে পেনাল্টি নিতে বলটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। পেনাল্টি কিক নিতে আমার সবসময়ই ভয় লাগে। তার ওপর আজ মাঠের বাইরে দিশা আর কয়েকটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যদি মিস্‌ করি তাহলে লজ্জায় মরে যাওয়া ছাড়া- উপায় থাকবে না। অন্য মেয়েগুলোকে নিয়ে আমার কোন মাথা-ব্যথা নেই। যত সমস্যা ঐ দিশাটাকে নিয়ে। ওর ওপর প্রচণ্ড রাগ হল। কী দরকার ছিল…এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের খেলা দেখার! টুর্ণামেন্ট-ফুর্নামেন্ট হলে না হয় একটা কথা ছিল। মেয়েটা এখনো কী জানে না … সে আশেপাশে থাকলে আমার পায়ের নীচের মাঠ কাঁপতে থাকে!

আমি স্বাভাবিকভাবেই পেনাল্টি মিস করলাম। হাসান বলে উঠল…
- গাধা… যেটা পারিস না ওইটা করতে যাস কেন?
আমি আড় চোখে দিশার দিকে তাকালাম। ইস! এমন একটা দিনে কিনা পেনাল্টিটা মিস হতে হল!

খেলা শেষে আমি দিশাকে কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম…
- কেমন আছিস?
- হুঁ। ভালো… তোর কি অবস্থা…গাধা?
- এই তো!
কথাটা বলে আমি দিশার দিকে বোকার মত হা করে তাকিয়ে থাকলাম…
- তুই তো ভালোই খেলিস। পেনাল্টি মিস করলি কেন?…গাধা
- এমনি!
দিশা হি হি করে হেসে উঠল…
- এমনি এমনি কি কেউ পেনাল্টি মিস করে? আচ্ছা যাই এখন… মা বকবে। ভালো থাকিস, গাধা।
মাগরিবের আযান শুরু হয়েছে। আমার মনটা খারাপ হয়ে উঠল। দিশা আমাকে গাধা বলে ডাকে কেন??

দেশের অবস্থা নাকি ভালো না। আব্বুরা বসে বসে এসব কথা বলে। আর সারাদিন রেডিওতে খবর শোনে। পাকিস্তানিরা আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে। আব্বু বলে দিয়েছে…যেন বাড়ি থেকে বের না হই।
স্কুলও বন্ধ। স্কুল যখন খোলা ছিল..যেতে ইচ্ছে হত না। আর এখন ইমরান…আতিক ওদেরকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে।
হোমওয়ার্ক করতে হয় না… পরীক্ষার কথা চিন্তা করে ভয় পেতে হয় না… আমার অসহ্য লাগে। আব্বু বাসায় না থাকলেই আমি বেরিয়ে যাই। দিশাদের বাসার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকি।

সন্ধ্যে সাতটার দিকে হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে বাড়িতে ঢুকল। আম্মুকে ডেকে বলল…
- শাহানা…এখানে আর থাকা যাবে না।
আম্মু আব্বুর অবস্থা দেখে ভয় পেল…
- কী হয়েছে তোমার? শান্ত হয়ে বস। এক গ্লাস লেবুর শরবত দেই?
- আরে রাখ তোমার লেবুর শরবত। মিলিটারি আসছে।
আম্মু এমনভাবে আমাকে কাছে টেনে নিল…মিলিটারি বুঝি আমাদের বাসায় চলে এসেছে। ঠিক তখন আমার একটা কথা মনে হল… আমার ফুটবলটা মাঠে ফেলে এসেছি…
আব্বু বলে চলেছে…
- আর থাকা যাবে না…জিনিসপত্র গুছায়ে নাও…কালই চলে যাব।
আব্বু চিরকালই ভীতু প্রকৃতির। অল্পতেই অস্থির হয়ে যায়। কিন্তু ঠিক এখন- আম্মুর গায়ের ঘ্রাণ নিতে নিতে আমার মনে হল… সামনে সত্যিই আমাদের ভয়ংকর বিপদ।

রাত দশটার দিকে আব্বুরা বাতি নিভিয়ে দিতেই আমি বাড়ি থেকে বের হলাম। ফুটবলটা নিয়ে আসতে হবে। আমাদের বাড়ি থেকে মাঠে যেতে পনের মিনিটের মত লাগে। আমি দৌড়াতে শুরু করলাম। মাঝপথে দিশাদের বাড়ি। যে দিশার সামনে আসলে আমার সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যায়- সেই দিশা।

দিশাদের বাড়ির সামনে এসে…আমি কান্নাকাটির আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমার বুকটা ধ্বক করে উঠল। দিশার কিছু হয়নি তো?

যে কাজটা করতে… কখনো সাহস পাই নি… এই অদ্ভুত রাতে সে কাজটাই আমি করে ফেললাম। দিশাদের বাড়িতে কড়া নাড়লাম… ভেতর থেকে কান্নাকাটির শব্দ আরো বেড়ে গেল।
- কে??…কে???
- চাচা… আমি ইমন।
- কোন ইমন??
আমি কিছু বলার আগেই দরজা খুলে গেল। দিশা দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রথম আমি দিশার চোখে জল দেখলাম। জিজ্ঞেস করলাম…
- কী হয়েছে?
- ভাইয়া…বাড়ি আসে নি।
বলে দিশা ঝরঝর করে কেঁদে উঠল। রনি ভাইয়া বাড়ি আসে নি? আমি কি বলব বুঝতে পারলাম না। ভাইয়ের জন্য কান্না করা একটা মানুষকে স্বান্ত্বনার কোন কথা বলা যায় না…আর সে মানুষটা যদি হয় খুব প্রিয় কেউ…তাহলে অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকা ছাড়া- আর কী করার থাকে?
দিশার আব্বু আমাকে বললেন…
- খোকা… বাড়ি যাও।
আমার খুব ইচ্ছে হল…আজ রাতে দিশার পাশে বসে থাকতে। দিশার দিকে তাকিয়ে বললাম…
- দিশা… আমরা মনে হয় কাল চলে যাব…এখান থেকে।
দিশা কেমন করে যেন আমার দিকে তাকিয়ে রইল। অদ্ভুতভাবে বলল…
- ভালো থাকিস।
আমি দৌড়ানো শুরু করলাম। দিশাকে আমি চোখের জল দেখাতে চাই না।
ফুটবলের কথা আমার মনে রইল না। আমি বাড়ির দিকে ছুটলাম। আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে। আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে।
বাড়ি ফিরেই আম্মুর চিৎকার শুনতে পেলাম… আমার ছেলে কই গেছে?…আমার ছেলে কই গেছে?…আব্বু আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল…আমাকে পাগলের মত মারতে শুরু করল।
- হারামজাদা কই গেছিলি? …
আম্মু ছুটে আসল… ছেড়ে দাও বলছি… আমি নিচু কণ্ঠে বললাম… দিশার ভাইয়া চলে গেছে… দিশা খুব কাঁদছে…দিশা খুব কাঁদছে।

এর পরেরদিনই আমরা বাসে আমাদের গ্রামের বাড়ি…ভালুকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলাম। মাঝপথে মিলিটারি চেকপোস্ট পড়েছিল। মিলিটারি এবং দুইটা বাংলায় কথা বলা লোক… আমার আব্বুকে আর কয়েকটা মানুষকে বাস থেকে নিয়ে গিয়েছিল। আব্বুর শেষ যে কথাটা আমার কানে এসেছিল সেটা হল…
- আমাকে মাফ করে দিস…বাপ… আমাকে মাফ করে দিস।

ভালুকায় মা’কে রেখে এক রাতের আঁধারে আমি যুদ্ধে গিয়েছিলাম।
আমাদের কমান্ডার মাহবুব ভাই আমাকে বাচ্চা বলে ডাকতেন। আমার মন খারাপ থাকলে…জড়িয়ে ধরে বলতেন…
- মা’র কথা মনে পড়ে?…বাচ্চা।
আমি জমির আইলের আড়ালে অস্ত্র হাতে লুকিয়ে থেকে… আমার মা’র কথা মনে করতাম…আমার বাবা’র কথা মনে করতাম…আমা’র দিশার কথা মনে করতাম… মাঠে ফেলে আসা আমার ফুটবলটার কথা মনে করতাম।

ঘাটাইলে এক যুদ্ধে লাল রক্ত নিয়ে আমার কোলে শুয়ে মাহবুব ভাই আমাকে বলেছিলেন…
- বাচ্চা…আমি জানি তুই একদিন অনেক বড় হবি। কথা দে… সেদিন তুই পৃথিবীর সব মানুষকে আমার গল্প বলবি!

মা কিংবা দিশার সাথে আমার আর কখনো দেখা হয় না। তবে যুদ্ধের পর দিশাদের বাসায় আমি আমার ফুটবলটা খুঁজে পাই। ভালোবাসার গান গেয়ে যাওয়া এক বিকেলে… ফুটবলটা আমি নদীতে ফেলে দিই এবং পাগলের মত কাঁদি।

এখনো আমি আমার মাকে খুঁজে বেড়াই… দিশাকে খুঁজে বেড়াই। হয়ত কোন একদিন কোন এক রাস্তায় দিশার সাথে আমার দেখা হবে। এতদিন পরেও দিশা আমাকে চিনতে পারবে… মা আমাকে চিনতে পারবে।

পাখির মত নরম কণ্ঠে দিশা আমাকে বলবে…
- ভালো আছিস? গাধা!

[[ মুক্তিযুদ্ধের পনের বছর পর আমার জন্ম। সেই অদ্ভুত মানুষগুলো কিংবা সেই অদ্ভুত দিনগুলোকে ছুঁতে পারা আমার জন্য হয়ত অসম্ভব। কিন্তু আমার কল্পনা করতে ভালো লাগে... সেই কল্পনায় যদি কিছু ত্রুটি থেকে যায়... আশা করি সবাই সেটা ক্ষমার খাতায় লিখে রাখবেন। সবার কাছ থেকে ক্ষমা পেতে পেতে স্বভাবটাই খারাপ হয়ে যাচ্ছে ইদানীং...]]

  1. ভালো হয়েছে লেখাটা।

All comments are screened for appropriateness. Commenting is a privilege, not a right. Good comments will be cherished, bad comments will be deleted.