একঃ
আমরা সবাই যার যার সীটে নড়ে-চড়ে বসলাম। পাশে সীটে বসা আবিদের দিকে তাকিয়ে দেখি- শালার মুখের বিভিন্ন অংশ সামনে চলে আসার প্রাণ-পণ চেষ্টা চালাচ্ছে। আমার নিজের অবস্থাও ব্যতিক্রম নয়। পেছন থেকে জামিল অশ্লীল একটা শব্দ করে বলল…
- মাল is back…
আমরা সবাই হেসে দিলাম। সব ছেলেরা হাসল। প্রায় মেয়েরা হাসল। আবিদ আমার দিকে তাকিয়ে বলল…
- দেখছিস? হাঁটার কায়দা আরো বেড়ে গ্যাসে।
আমি মুখে সমর্থন-সূচক একটা ভাব আনলাম। তারপর আবার ফারিয়ার দিকে তাকালাম। ফারিয়া পেছনের দিকে একটা বেঞ্চে বসল।
ফারিয়া আমাদের ডিপার্টমেন্ট তথা ইউনিভার্সিটির হট-কেক… অসংখ্য কু-কাহিনীর নায়িকা। আমরা সবাই ফারিয়াকে ঘৃণা করি এবং বিশেষ একটা কাজের স্বপ্ন দেখার সময় ফারিয়ার সংগ কামনা করি।
পেছনে যথারীতি জামিলের মুখে কথার ফোয়ারা ছুটছে…
- চোখের নীচে কালি জমতে জমতে তো পুরা কালি হয়ে গ্যাসে…
- এই কয় রাত মনে হয় একটুও ঘুমায় নাই…
অন্য একজন বলে উঠল…
- ঘুমাবে ক্যামনে? ঘুমানোর টাইম আছে? কত মানুষকে খুশি করতে হয়…
ক্লাসরুমে এখনো কোন স্যার আসে নি। ফারিয়াকে নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা হচ্ছে- এই কয়দিন ফারিয়া কই ছিল?… ফারিয়া এখনো পর্যন্ত কত লোকের সাথে… আর আমরা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাই। এরইমধ্যে একফাঁকে আমি ফারিয়ার দিকে তাকালাম… মাথা নীচু করে খাতায় কী যেন লিখছে… আর নিজে নিজেই হেসে উঠছে…
আমি আজ পর্যন্ত ফারিয়াকে কারো সাথে কথা বলতে দেখি নি। আমরা যখন আশপাশ থেকে দাঁত বের করে বিভিন্ন ধরণের শব্দের খেলায় অংশ নেই… ফারিয়া এমন একটা ভাব করে থাকে যেন কিছু শুনতে পাচ্ছে না। ফারিয়ার এই মৌনতা আমাদের দমিয়ে রাখতে পারে না… বরং আমরা চারগুণ উৎসাহে আমাদের খেলা চালিয়ে যাই… নিজেদের সুর করা গান গাই… ফারিয়া ও ফারিয়া… তোমার নাকি দশটা বাচ্চা… না করে বিয়া…
ফারিয়ার ব্যাপারটা আবিষ্কার হয়েছিল কয়েক মাস আগে। বিকেলে এলাকার এক বড় ভাইয়ের বাসায় গান বাজনা করছিলাম। হঠাৎ জামিল ফোন করল…
- ঐ… তুই কোথায়… এদিকে তো ঘটনা ঘটে গ্যাসে…
জামিলের কণ্ঠে বাঁধভাঙ্গা উত্তেজনা। আমি তেমন একটা আগ্রহ দেখালাম না… সামান্য ব্যাপারেই জামিল অসামান্য উত্তেজিত হয়ে যায়। নীরস কণ্ঠে বললাম…
- কী হইছে?
- তাড়াতাড়ি আসাদ ভাইয়ের বাসায় চলে আয়… তাড়াতাড়ি।
- কী হইছে বল্ না।
- আরে… মামা…সেইরকম ঘটনা। আস্লে আয়… নইলে জানার দরকার নাই…
কোন কারণ ছাড়াই আমি আসাদ ভাইয়ের বাসার দিকে ছুটলাম। আসাদ ভাই সেকেন্ড ইয়ারে। কু- ভিডিও’র বিশাল সংগ্রহের জন্য আসাদ ভাই আমাদের মাঝে বিখ্যাত।
জামিল আমাকে একটা কু-ভিডিও দেখাল। নায়িকাকে আমি চিনতে পারলাম। আমাদের ডিপার্টমেন্টের ফারিয়া। রহস্যময়ী ফারিয়া… যে মেয়েটা কারো সাথে কথা বলে না…সেই ফারিয়া… আমাদের মতে- অহংকারী ফারিয়া।
এর পরের এক সপ্তাহে সেই ভিডিও সিডিটা সবার মধ্যে ছড়িয়ে গেল… আমি জানতাম মেয়েরা এসব জিনিস দেখে না… আমার ধারণা ভুল প্রমাণ করে মেয়েরাও আগ্রহ ভরা মুখে সেই সিডি নিতে লাগল… এবং ধীরে ধীরে ফারিয়ার বিভিন্ন কাহিনী সবার আগ্রহের বিষয় হয়ে দাঁড়ালো।
দুইঃ
সকাল এগারোটার মত বাজে। ক্লাস অফ। আমরা ক্যাণ্টিনে বসে আছি। জামিল তার মোবাইলের কালেকশন নিয়ে বসেছে। আমরা আগ্রহ নিয়ে দেখছি। হঠাৎ দেখলাম ফারিয়া ক্যান্টিনে ঢুকল। কাউন্টার থেকে এক কাপ কফি নিয়ে- একটা ফাঁকা টেবিলে বসল। আমরা মোবাইল থেকে চোখ সড়িয়ে জায়গামত নিয়ে আসলাম। হঠাৎ আমি ফারিয়ার টেবিলের কাছে গিয়ে বললাম…
- ম্যাডাম… গতরাতে ঘুম হয়েছে?
ফারিয়া কিছু বলল না। মাথা নীচু করে কফির দিকে তাকিয়ে রইল… আমার মাথা তখন আগুন হওয়া শুরু করেছে… কণ্ঠ ন্যাকা ন্যাকা করে বললাম…
- ইসসিরে ম্যাডাম… আপনার জন্য বড় খারাপ লাগে… কত মানুষের সুবিধা- অসুবিধা দেখতে হয়।
মেয়েটার ধৈর্য্য দেখে আমি অবাক হই… আমিও অসীম ধৈর্যের সাথে বলতে থাকি…
- নতুন ভিডিও-টিডিও আসছে নাকি? আসলে দিয়ে আমাদের একটু ধন্য করেন…
আমাকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে ফারিয়া চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। কিভাবে যেন তাকাল আমার দিকে। এরপর নিজের শরীরের দিকে ইশারা করে বলল…
- কী? দেখতে চাও? ok দেখাচ্ছি… সবাইকে ডেকে নিয়ে আসো… ইচ্ছামত দেখ… যা ইচ্ছা তাই কর…
আমি দেখলাম…মেয়েটা সত্যি সত্যি তার পোশাকে হাত দিচ্ছে… সবাই ছুটে আসল… ফারিয়াকে থামানো হল…
আমি শুনতে পেলাম- জামিল বলছে…
- কী মেয়েরে বাপ!
তিনঃ
- দোস্ত… এসব মাইয়াদের সাথে গডফাদার টাইপ থাকে… টের পাইলে কিন্তু খবর আছে।
আমাদের আগ্রহের কোন শেষ নেই। অসম্ভব আগ্রহের ফল হিসেবে- আমরা এখন ফারিয়ার বাসার সামনের রাস্তায়। ‘ফারিয়া উন্মোচন’ এর প্রথম ধাপ। ‘ফারিয়া উন্মোচন’ নামটা আবিদের দেয়া। আবিদ কবি মানুষ।
জামিল ঘোষণা করল… lets go…আমরা কাঁপা কাঁপা বুকে ফারিয়ার বাসার দিকে রওনা হলাম।
জানালার ভেতর দিয়ে আমরা তাকিয়ে আছি। ফারিয়ার হাতে মদের বোতল। ইংরেজী সিনেমার নায়িকার মত ভাব। পাশে হিংস্র টাইপ চেহারার একটা মানুষ। মানুষটা বলল…
- এইসব ঢং বন্ধ কর… ইউনিভার্সিটিতে পড়তে চাইছিলা দিছি… আলাদা বাসা চাইছিলা দিছি… কইত্থেকে কুড়াইয়া আনছি তোমারে মনে নাই?
ফারিয়া কোন কথা বলে না। কেমন করে যেন তাকিয়ে থাকে। লোকটা তার কর্কশ কণ্ঠে বলে চলে…
- আমারে বিয়া করবা না… জোর করি নাই… এখন কথা না শুনলে কিন্তু খুন-খারাবি হইয়া যাইব…
লোকটার কণ্ঠে ভয়ংকর কিছু একটা আছে… আমার গা শিরশির করে উঠল।
- কালকে রাতে রেডী হইয়া থাকবা… আজমল সাহেব যদি কোন কম্পলেইন দেয়… তোমার খবর আছে কইলাম।
- তোমার যা খুশি তাই কর… এসব আমি আর করতে পারব না… আমাকে মেরে ফেলবা?…মারো।
লোকটা গর্জে ওঠে। আমি অবাক হয়ে দেখি… ফারিয়া কাঁদছে… আমাদের বহু কু-কল্পনার সংগী- ফারিয়া… কাঁদছে…
আমি অনেক কিছু বুঝে গেলাম… আবিদের দিকে তাকালাম… জামিলও মাথা নীচু করে আছে। হঠাৎ খেয়াল করলাম… আমার হাতের ওপর কয়েক ফোঁটা পানি এসে পড়েছে… ”নষ্ট মেয়ে” ফারিয়ার জন্য আমার চোখে জল জমা হয়েছে…
[[ এর পরের ঘটনা এই গল্পের শিরোনামের সাথে তেমন একটা সম্পর্কযুক্ত নয় দেখে লিখলাম না...হয়ত অন্য কোনদিন... অন্য কোন শিরোনামে আবার ফারিয়ার গল্প আমি লিখব ]]
ধারণা একে বারে খারাপ না। এটা কিছু নারীদের সভ্বাব।
আসলে বিপদে পড়ে অনেকেই এমনটা করতে বাধ্য হয়।
আবার স্বভাব ও রয়েছে অনেকের।
আমিও S.M. Mehdi Akram [ROYAL] এর সাথে একমত।