bokashoka

ডাংগুলি ছেলে এবং আমসত্ত্ব্ব মেয়ে —- ১

In উপন্যাস on মার্চ 18, 2008 at 8:19 pm


ইস্কুল থেকে ফেরার পথে গাড়িটা দেখলাম। কী সুন্দর! আমরা গাড়ির পেছন পেছন দৌড়াতে লাগলাম। গাড়ির ভেতর থেকে… একটা মেয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে আর খুব হাসছে। আমার খুব লজ্জা লাগল… দৌড় থামিয়ে সালামকে বললাম।
- ঐ থাম। আর দৌড়াইস না।
- ক্যান। কী হইছে?
এখন যদি বলি- একটা মেয়েকে দেখে লজ্জা পেয়েছি- সবাই খুব হাসাহাসি করবে। তাই বললাম…
- এমনি। পা ব্যথা করতেসে।
হঠাৎ বুঝতে পারলাম- শার্টের ভেতর বাঁশিটা নেই। একটু আগে বাঁশিটা কিনেছি। চার টাকা দাম। শার্টের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিলাম। আমার কান্না পেতে লাগল। চোখ দিয়ে বোধ-হয় একটু পানি বের হয়েছে ইতোমধ্যে। হাবলু বলল।
- কী রে। কাঁদস ক্যান? পায়ে ব্যথা করলে কাঁদতে হয় নাকি?
- আমার বাঁশি পাইতেসি না।
সালাম যাদু দেখানোর মতো কোত্থেকে বাঁশিটা বের করে বলল।
- এই নে। গাধু। দৌড়ানোর সময় ফালায়া দিসিলি…বাড়ির সামনে এসেই আমার বুকটা খচ-খচ করতে লাগল। বাঁশি দেখলে আব্বা খবর করে দিবে। বাড়ির উঠোনে ঢোকার আগে- শার্টের ভেতরে বাঁশিটা আরো একবার দেখে নিলাম।উঠোনে মা কাপড় শুকোতে দিচ্ছিল। মা’কে দেখলেই আমার জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে। কেন করে কে জানে!
- মা। আব্বা কোথায়?
- ক্যান? অখনো আসে নাই।
আমি শার্টের ভেতর থেকে বাঁশিটা বের করলাম। মা বলল…
- এইডা কী?
- ক্যান… বাঁশি। তুমি বাঁশি চেন না বুঝি।
- তোর বাপে দেখলে মাইরা ফেলব।
- দেখব না। আমি লুকাইয়া রাখুম।
- দেখিস। তোর বাপ দ্যাখে না যেন!
আমি জানতাম- মা কিচ্ছু বলবে না। আমার মা তো হাবলু রাশুর মায়ের মত না। বাঁশি কিনেছি দেখে বকা দিবে।
রাশুটা হাবলু হলে কী হবে- এত মিষ্টি করে বাঁশি বাজায়। বিকেলে আমি অবাক হয়ে রাশুর বাঁশি শুনি। আমি রাশুকে বলি-
- ঐ হাবলু। বাজনা শুনব।
প্রথমে হাবলু লজ্জা পায়। তারপর স্কুলের পেছনের টিলায় হাবলু বাঁশি বাজানো শুরু করে।
”আমার শ্যাম যদি… হইত মাথার কেশ।”
গত বছর- সালমা আপার বিয়েতে গানের দল এই গানটা করেছিল। গানের কথাগুলো- আমার মাথায় ঢুকে না। তবুও রাশুর বাজনা শুনে -আমার শরীর কেমন কাঁপতে থাকে। গলা খুলে কান্না করতে ইচ্ছে করে! সালামকে আমি একদিনই কাঁদতে দেখেছিলাম। যেদিন সালমা আপা মারা যান। আমার বুকে মাথা রেখে সালাম পাগলের মত চিৎকার করছিল… আমার ভইনরে কোথায় নিছস তোরা?…

বিকেলে বাড়ি থেকে বের হয়েছি। বুকে একরাশ উত্তেজনা… আজ থেকে রাশুর কাছে বাঁশি শিখব। দুপুরে আব্বা বাড়ি আসার আগে একটু চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু কোন শব্দ বের হয় না। আমার পাগলামি দেখে মা বলল।
- তোরে দিয়ে বাঁশি বাজান হইবোনা… দাঁড়া আমি বাজায়া দেখাই।
মা আমার হাত থেকে বাঁশি নিয়ে ফু দিচ্ছে। আমি হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতে লাগলাম। মা মুখে বানানো রাগ ফুটিয়ে বলে।
- খবরদার…হাসবি না কইলাম!
তারপর মা নিজেই হেসে দেয়। নিজেকে আমার অসম্ভব সুখী একটা ছেলে মনে হয়।

রাশুদের বাড়ির সামনে আসতেই অন্যরকম একটা কন্ঠ আমাকে ডাকল।
- এই যে!
আমি তাকিয়ে অবাক হয়ে যাই। সেই মেয়েটা। গাড়ির ভতরের সেই মেয়েটা। আমি বললাম।
- জ্বী…আমারে বলতেসেন?
মেয়েটা ফিক করে হেসে দিল। মুখটা কেমন করে যেন বলল।
- হুঁ। তোমরা গাড়ির পেছনে ওভাবে দৌড়াচ্ছিলে কেন?
আমি মাথা নীচু করে রইলাম। সব সালামটার দোষ। ওর বুদ্ধিতেই তো দৌড়াতে গেলাম।
- কী কথা বলছ না কেন?
- সব সালামের দোষ।
মেয়েটা খিল খিল করে হাসতে লাগল।
- দোষ হতে যাবে কেন?
আমি বোকার মত তাকিয়ে রইলাম। কী বলব বুঝতে পারছি না। মেয়েটার মনে হয় হাসি-রোগ আছে। হাসছে তো হাসছেই… থামার কোন লক্ষণ নেই। হাসতে হাসতেই আমাকে বলল।
- নাম কী তোমার?
- মোহাম্মদ মনোয়ার হোসেন।
- ও বাবা। এত লম্বা নাম আমি মনে রাখতে পারব না। ছোট একটা নাম বল।
- মনু।
- হাতে কী ওটা?
- বাঁশি।
- তুমি বাঁশি বাজাতে পারো?
- না। রাশু বাজাইতে পারে।
- রাশু কে? তোমাদের দৌড়ানো দলে ছিল নাকি?
- হ। এখন রাশুর কাছে বাঁশি শিখতে যাইতেসি।
মেয়েটা কেমন করে যেন বলল।
- আমিও বাঁশি শিখব। আমাকে নিয়ে যাও না।
আমি কিছুই বুজতে পারছি না। একটা মেয়ে এভাবে কথা বলতে পারে আমার জানা ছিল না। কখনো এরকম সুন্দর কোন মেয়ে আমি দেখি নি। রশিদ কাকাদের টিভিতে মাঝে মাঝে নাটকে দেখেছি শুধু। মেয়েটা আবার বলল।
- কী হলো? হাবার মত দাঁড়িয়ে আছ যে। চল…
আমি বোকার মত হাঁটতে লাগলাম। মেয়েটা আমার পাশে পাশে হাঁটছে আর পকপক করে কথা বলেই যাচ্ছে।
- আমার নাম জানতে চাও না? আমার নাম এশা। কিউট না নামটা?
আমি কোন কথা বলি না। চুপ করে থাকি। এসব কথা শুনে কী বলতে হয়- আমার জানা নেই।
- কোন ক্লাসে পড় তুমি?
- কেলাস সিক্স।
- কী আশ্চর্য! আমিও ক্লাস সিক্সে… তোমাদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয় নি? আমাদের তো কবেই শেষ। লম্বা ছুটি… তাই তোমাদের গ্রামে বেড়াতে আসলাম। তোমাদের চেয়ারম্যান আমার আব্বুর বন্ধু।

রাশু বাঁশি বাজালো না। আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলল- একটা মেয়ের সামনে ও বাঁশি বাজাতে পারবে না। আমি হাবলুটাকে কিছু বললাম না।

মেয়েটা বোধহয় মন খারাপ করল। কেমন যেন চুপ-চাপ হয়ে গেল হঠাৎ। শুধু আমাকে বলল।
- পুরো গ্রামটা ঘুরিয়ে দেখাও না আমাকে?
- জ্বী আচ্ছা।
- জ্বী আচ্ছা বলছ কেন? আমি কী তোমার টিচার নাকি?
বলে এশা আবার ফিক করে হেসে দিল। হঠাৎ করে আমার মনে হলো- ‘এশা’ নামটা সত্যিই সুন্দর!

এর পরের কয়েকদিন আমার জীবনে অনেক কিছু ঘটে গেল। আমার বাঁশিটা আব্বা দেখে ফেলল। এসব আলতু-ফালতু জিনিস যদি আর কখনো বাড়িতে দেখে- তাহলে আমাকে আর মা’কে বাড়ি থেকে বের করে দিবে বলে হুমকি দিল। অনেক ভালোবাসার বাঁশিটা পুকুরে ফেলে দেওয়া হল।

প্রতি ভোরে মক্তবে যাই- এরপর স্কুল। এশাকে নিয়ে গ্রাম দেখি। মেয়েটা এত অবাক হতে পারে! সালামরা যখন সাইকেলের চাকা দিয়ে গাড়ি গাড়ি খেলে- এশা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে… আমার দিকে তাকিয়ে বলে…
- কী মজার খেলা…তাই না? আমিও খেলব।
এশার এসব অদ্ভুত কথা শুনে – আমারও মজার কিছু বলতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু মাথায় কিছুই আসেনা… শুধু বোকার মত মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকি। আমি এশাকে আমাদের স্কুল-ঘরে নিয়ে যাই। দেয়ালে ”সায়মন+ আকিদা” লেখা দেখে এশা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খায়।
আমি এশাকে আমাদের গ্রামের ভূতের বাড়ি দেখাতে নিয়ে যাই। গভীর রাতে যে এখানে একটা বুড়িকে দেখা যায়- সেই গল্প বলি। এশা ফিক করে হেসে দেয়।
- ভূত-টুত কিচ্ছু না। ফেলুদাকে নিয়ে আসলে ঠিকই আসল ঘটনা বের করে ফেলত।
- ফেলুদা কে?
এশা আমার প্রশ্নের উত্তর দেয়। আমার জন্য ফেলুদার বই নিয়ে আসে। ইস্কুলের বই বাদে পৃথিবীতে আরো অনেক বই আছে- আমি জানতে পারি। অপু নামে যে আমার মত একটা ছেলে আছে- এ কথা আমি জানতে পারি। শহরে- গিয়ে আমার জন্য- আর অনেক বই পাঠাবে- এশা বলে।

এশা আমাকে অনেক গল্প বলে। আমি অবাক হয়ে শুনি। আমিও আমার জীবনের গল্প এশাকে বলি… আমার মা কত ভালো সেই গল্প বলি… আমার বাবার গল্প বলি… ক্লাস ফাইভে স্কুলে দৌড় প্রতিযোগিতায় যে সেকেন্ড হয়েছিলাম… সেই গল্প বলি… সালমা আপার গল্প বলি… সালমা আপার মারা যাওয়ার গল্প শুনে এশা ঝরঝর করে কেঁদে ফলে। আমি অসহায়ের মত এশার ভেজা মুখটার দিকে তাকিয়ে তাকি।

একদিন আমাদের বাড়িতে এশাকে নিয়ে আসি। মা ওকে নারকেল-মুড়ি খেতে দেয়। লজ্জায় আমার মুখ লাল হয়ে যায়। ওদিকে এশা হাত নেড়ে নেড়ে মা’র সঙ্গে গল্প করতে থাকে।
- আন্টি। আপনাদের বাড়িটা খুব সুন্দর।
- হ… কইছে তোমারে। সুন্দর হইলা গিয়া তুমি… মা।
এমন সময় আব্বা হাজির হয়। ভয়ে আমার বুক কাঁপতে থাকে। কিন্তু আব্বা কিছুই বলে না। এশাকে জিজ্ঞেস করে।
- কেমন আছ… মা? তোমার বাপে কই?
আমি অবাক হয়ে আমার আব্বার দিকে তাকিয়ে থাকি। এশা অভিমানী কণ্ঠে বলে…
- আপনি মনুর এত সুন্দর বাঁশিটা পুকুরে ফেলে দিলেন কেন?
- ভুল হইয়া গ্যাসে…

- এই দেখ। এক ডুব দিয়া কতক্ষণ থাকুম।
এশা পুকুর পাড়ে বসে আছে। আমার সাঁতার কাটা দেখছে। আমি ডুব দেই… এশা চিৎকার করে… ডুবে গেলে নাকি?
আমি পুকুর থেকে মাথা উঠিয়ে হাসতে থাকি। এশা হাসি মুখে বলে-
- আমারও ডুব দিতে ইচ্ছে করছে।
- তুমি তো সাঁতরাইতে পারো না…
- পারি তো…গতবছর শিখেছি…নামব
আমি মজা করে বলি- না …

…এবং একদিন এশার বিদায়ের বিকেল এসে গেল।।

(চলবে…)

  1. কি মিয়া? খালি মাইয়া নিয়া লেখা! কয়তা প্রেম করা হয়?