আজ সকালে আম্মু আবার ফোন করল।
- বাবা। বিয়েটা কর্। লোকে বলাবলি করে- ”ছেলের বয়স একুশ হয়ে গেছে, এখনো বিয়ে করছে না।” লজ্জায় তো মানুষজনকে মুখ দেখাতে পারছি না। তোর আব্বু ঘর থেকে বের হওয়াই বন্ধ করে দিয়েছে।”
আব্বু-আম্মু গত দুই বছর ধরে ওই একই কথা বলে আসছে। -বিয়ে কর্। বিয়ে কর্।
আমি যথারীতি আম্মুর কথা এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দিলাম।
সকাল সাতটা বাজে। গোসল করে- চুল পরিপাটি করে ইউনিভার্সিটির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। আটটা থেকে ক্লাস। ক্লাসে এক মিনিটও দেরী করতে আমার ভালো লাগে না। তবে ইউনিভার্সিটিটা আমার বেশ পছন্দ- তা কিন্তু না। মেয়েতে গিজগিজ করে সারাদিন। আমাদের ক্লাসে সর্বসাকুল্যে চার পাঁচটা ছেলে আছে। বাকী সব মেয়ে।
ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে গিয়ে আমার মেজাজ তিরিশ হাজার সেণ্টিগ্রেড ডিগ্রীতে পৌঁছে গেল। কী একটা কারণে- আজকের সকল ক্লাস বাতিল করা হয়েছে। এটা কোন কথা হল? ক্লাসের কথা না হয় বাদই দিলাম। পৃথিবীর সবচে মজার কাজ হলো- ল্যাব করা। আজ দুইটা ল্যাব হওয়ার কথা। দুইটায় বাদ দেওয়া হয়েছে। শালার আজ দিনটাই খারাপ যাবে।
মন খারাপ করে চলে আসছি- এমন সময় অনেকগুলো মেয়েকে আমাকে ঘিরে দাঁড়ালো।
কেউ বলছে- হাসান, চল না কোথাও থেকে ঘুরে আসি। আবার কেউ বলছে- গতরাতে ফোন করেছিলাম… রিসিভ করলেনা কেন?
আমার মুখ আরো শুকনা হয়ে গেল। মেয়ে জিনিসটা আমার এমনিতে পছন্দ না। মেয়েদের সাথে কথা বলতে আমার ভালো লাগে না। মেয়েদের সাথে ঘুরোঘুরি করতে আমার ভালো লাগে না।
সবচে বড় কথা হলো- আমি চাপাও মারতে পারি না। মেয়েগুলোকে কিছু একটা মিথ্যা কথা বলে যে এড়িয়ে যাবো- তারও উপায় নেই। সুতরাং বাধ্য হয়েই সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের সাথে ঘুরোঘুরি করলাম।
এতগুলো মেয়ে। সবাইকে আর আলাদা আলাদা সময় দিতে পারলাম না। তাই সবাইকে নিয়ে একসঙ্গেই ঘুরতে হল। রেস্টুরেন্টে খাওয়া দাওয়া করার পর বিল দিতে যাবো- ওরা রীতিমত যুদ্ধ লাগিয়ে দিল… তুমি টাকা দিতে যাচ্ছ কেন? আমি দিই… শেষ পর্যন্ত সবাই ভাগাভাগি করেই বিল দিল।
ফার্মগেট থেকে বাসে উঠলাম। পুরো বাসে হাতে গোনা দুই একটা যাত্রী। চোখের পলকেই উত্তরা পৌঁছে গেলাম। উত্তরা বাস কাউন্টারে নতুন যাত্রী উঠল। একটা মেয়ে। বাসের এতগুলো খালি সিট ফেলে মেয়েটা আমার পাশে এসে বসল। আমার দিকে তকিয়ে হেসে বলল।
- হাই!
যা…শালা। আজ দিনটাই খারাপ! পাশ থেকে অন্য একজন যাত্রী বাসের হেল্পারকে ডাকল।
- ভাই। তাড়াহুড়ো করে উঠতে গিয়ে- বাসের টিকিট কাটা হয় নাই। এই নেন টাকা।
লোকটার কথায় হেল্পার খুব লজ্জা পেল।
- আরে বড় ভাই। কী যে বলেন! টাকা লাগবে না। শুধু টাকা দিয়ে কী ব্যবসা করা যায়? ওদিকে আমি মনে মনে চিন্তা করছি- কখন বাসায় যাব? কখন পড়তে বসব?
আমি থাকি টঙ্গীতে। মেসই বলা যায়। টঙ্গীতে নেমে একটা খবর শুনলাম। বাংলাদেশে সাউথ আফ্রিকাকে নয় উইকেটে হারিয়েছে। তেমন একটা অবাক কিংবা খুশি হলাম না। সাউথ আফ্রিকা বাংলাদেশের একটা উইকেট ফেলেছে। এটাই তো রীতিমত লজ্জার বিষয়।
আশপাশের লোকজনও দেখলাম- যে শালা আউট হয়েছে তার চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করছে।
গোসল করেই পড়তে বসে গেলাম। আহা! পড়ালেখায় এত্ত আনন্দ! হঠাৎ একটা মেয়ে কণ্ঠ শুনতে পেলাম।
- ভাইয়া কেমন আছেন?
বাড়ীওয়ালার মেয়ে। নামটা ঠিক মনে নেই। হাতে একটা খাবারের বাটি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মনে মনে প্রচণ্ড বিরক্ত হলাম।
- হুঁ। তোমার কী খবর?
- এই তো। ভালো। আম্মু আপনার জন্য খাবার দিয়েছে।
- আচ্ছা। রেখে যাও।
মেয়েটা আমার পড়ার টেবিলে খাবারের বাটিটা রাখল। মাথা নীচু করে বলল।
- ভাইয়া। চিঠিটার উত্তর দিলেন না!
বিরক্তি প্রকাশ করেই বললাম।
- কোন চিঠি?
- ঐ যে। সেদিন আপনাকে দিলাম।
- ও… চিঠিটা জানি কোথায় রাখলাম? পড়াই তো হয় নি…
রাত নয়টার পর থেকেই ফোন আসতে লাগল। মেয়েরা ফোন করছে। – কেমন আছ? – ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করেছ তো???
মেয়েরা এত ডিস্টার্ব করে!
ঠিক এগারোটায় দিকে শুয়ে পড়লাম। সকালে উঠে আবার পড়াশোনা করতে হবে। সবেমাত্র ঘুম ঘুম ভাব এসেছে- একটা মেয়ে আমার হাত ধরে ঝাঁকাতে লাগল।
- এই ওঠ না।
আমি ঘুম ঘুম চোখে মেয়েটাকে চেনার চেষ্টা করলাম। নিজের উপর নিজেরই রাগ লাগতে লাগল। বাসার দরজা খোলা রাখলে- চোর ডাকাত আসে না ঠিকই। কিন্তু মেয়েরা ঢুকে পড়ে। এর পর থেকে দরজা বন্ধ করে ঘুমাতে হবে। মেয়েটার দিকে ভালো করে তাকালাম।
ঘুম পুরোপুরি ছুটে যেতেই দেখি- আমার এক রুমমেট বলছে।
- ঐ হাসান ওঠ। সকাল থেকেই বাড়িওয়ালা চিল্লাচিল্লি করছে বাড়িভাড়ার জন্য। বাপের সাথে সাথে মেয়েও চিল্লাচ্ছে।
আমি বিরস- বিদনে বদনা নিয়ে- মেসের টয়লেটের সামনে লাইনে দাঁড়ালাম। লাইনের সামনের দিকে বেশ হৈ-চৈ হচ্ছে। কে যেন বলছে।
- কী ভাই… এতগুলা মানুষ লাইনে দাঁড়ায় আছে। এতক্ষণ কী করেন? হাতী খাইয়া টয়লেটে ঢুকছেন নাকি?
মজা পেলাম লেখাতা পড়ে। আহ! এইরকম হলে কি ভালোই না হত!