bokashoka

শুধুই মমতা’র গল্পঃ গর্ভধারিণীর যন্ত্রণা এবং ভালোবাসা

In গল্প on মার্চ 15, 2008 at 2:25 pm


মা, তোমাকে কতবার বললাম কম্পিউটারের ইউজটা শিখে ফেল। নেটে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাইয়াদের সাথে কথা বলতে পারবে। ইচ্ছা করলে ওয়েবক্যাম দিয়ে ওদের দেখতে পারবে।
আমার কী এখন কম্পিউটার শেখার বয়স আছে? কিন্তু বাবুন সেটা কিছুতেই বুঝবে না। রোজ কম করে হলেও তিনবার আমাকে এই কথা শোনাবে।
বাবুনটা এমন পাগল! বাবুন আমার ছোট ছেলে। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারের মা কম্পিউটার সম্পর্কে কিছুই জানে না। ও বোধহয় সেটা মেনে নিতে পারে না। আমি হেসে বললাম।
- তোর মা বুড়ি হয়ে গ্যাছে না? বুড়িরা কী এসব পারে?
- কেন? সালমা আন্টি নেটে কী সুন্দর সব লেখা লেখে!
- থাক। আমার অত আধুনিকা হয়ে কাজ নেই।
- আর কয়েকদিন পর দেশের বাইরে চলে যাব। মোবাইল দিয়ে আর কতক্ষণ কথা বলা যায়?
সাথে সাথে আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। বড় দুইটা অনেক আগেই গিয়েছে। এবার ছোটটার পালা। হতভাগা চোখ দুইটা এত যন্ত্রণা দেয়! মুহুর্তের জন্যও পানি আটকে রাখতে পারে না। আল্লাহ! তুমি আমার চোখ থেকে পানি নিয়ে যাও। ভেজা চোখ আমি আর আমার ছেলেকে দেখাতে চাই না।
- মা। তুমি কাঁদতেছ?
- আরে না…বোকা। কাঁদব কেন?
- আমি আমেরিকা যাই… সেটা তুমি চাওনা। তাই না?
- আমার বোকার মত কথা বলে। ছেলে বিদেশ যাবে পড়াশোনা করতে, অনেক বড় হবে…আর আমি মা হয়ে সেটা চাইব না। এটা কোন কথা হল?
- মা তুমি এত ভালো কেন?
বাবুন আমাকে জড়িয়ে ধরল। অনেক লম্বা হয়েছে ছেলেটা। ঠিক তার বাবার মত। আমার মাথাটা ওর বুকে।
হঠাৎ অনেক আগের একটা দৃশ্য আমার মনে পড়ে গেল। তখন বাবুন ক্লাস সেভেনে। ক্যাডেট কলেজে যাবে। প্রথম দিন ওকে যখন দিয়ে আসছি- বাবুন আমাকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মত কাঁদতে শুরু করেছে। আমার বুকে চোখ ঘষে- চোখের জল মুছছে। আর এখন আমি বাবুনের মুখে চোখ মুছে কান্না থামাতে চাইছি। সময় কী অদ্ভুত। কত কিছু বদলে দেয়!

আগামীকাল বিকালে বাবুন চলে যাবে। এখন বাজে রাত দেড়টা। ঘুম আসছে না আমার। ছেলের আসন্ন বিদায়ের সময় কোন মা কী ঘুমাতে পারে? জায়নামাযে বসে আছি। নামায পড়া হচ্ছে না। বারবার পাহাড়ের মত কিছু একটা গলা বেয়ে উপরে উঠছে। আমার বাবুন কাল চলে যাবে। আমার আদরের বাবুন কাল চলে যাবে।
বড় দুই ছেলেকে নিয়ে আমি একটুও চিন্তা করি না। বউ-বাচ্চা নিয়ে ওরা সুখেই আছে। সপ্তাহে একবার মাকে ফোন করে। মাসে মাসে টাকা পাঠায়। ভালোই তো! চোখে জল নিয়ে এসব কথা চিন্তা করছি- ঠিক তখন বাবুন আমার ঘরের দরজায় এস দাঁড়াল। হাতে একটা বালিশ।
- মা। আজকে তোমার সাথে শোব।
তখন বাবুনের বয়স কত ছিল? রোজ রাতে আমার ঘুম ভাঙ্গিয়ে ঠিক এই কথাটাই বলত। আমি বললাম।
- আয়।

বাবুন আমার পাশে শুয়ে আছে। ছোট্টবেলায় ও যখনই আমার সাথে শুত- একটা পা ঠিক আমার গায়ের ওপর তুলে দিত। আর এখন!
আমার বাবুন বড় হয়ে গিয়েছে।
- বাবা। যেখানেই যাস- মায়ের জন্য একটুও মন খারাপ করবি না, ঠিক আছে?
- হুঁ।
বলেই বাবুন ঝর-ঝর করে কেঁদে দিল।
- বোকা ছেলে। কাঁদছিস কেন?
- তোমাকে ছাড়া আমি কোথাও থাকতে পারব না, মা। তোমাকে একা রেখে আমি কোথাও যাব না।
- এসব কথা একদম বলবি না। আমি সবাইকে কত বলি- আমার ছেলে বিদেশ যাচ্ছে পড়াশোনা করতে। মনে আছে তোর- ক্লাস থ্রিতে একবার পরীক্ষায় খারাপ করে পালিয়ে গিয়েছিলি। তোর বাবা তো পাগলের মত হয়ে গেল। পরে দেখি- খাটের নীচে লুকিয়ে আছিস।
আমি হাসলাম। বাবুনও হেসে দিল।
- বাবুন। একটা গান শোনাবি? তুই কত গীটার-টীটার বাজাস। কই মাকে তো একটা গান শোনালি না কোনদিন! কী শোনাবি না?
আমাকে অবাক করে দিয়ে বাবুন উঠে বসে।
- চল মা। ছাদে যাই।

বাবুন গীটার বাজিয়ে গান গাচ্ছে। গানের কথাগুলো কী রহস্যময়-
”আমার চোখ বেঁধে দাও আলোয়-
দাও শান্ত শীতল পাটি।
তুমি মায়ের মত ভালো-
আমি একলাটি পথ হাঁটি”
আমার ছেলে কী অদ্ভুত সুন্দর গান গায়! অথচ আমি ভালো করে কখনো শুনে দেখি নি। গান থামিয়ে বাবুন আমাকে বলে।
- মা। তুমি একটা গান গাও না!
- যাঃ আমি গান পারি নাকি?
খুব ছোটবেলায় আমার গানের গলা বেশ ছিল। বাবার সাথে কত গানের কলি খেলেছি।
বৃদ্ধা হয়ে যাওয়া কণ্ঠে আমি গান গাওয়া শুরু করি। আকাশে বাঁকা একটা চাঁদ। বাবুন হাতে গীটার নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে তাকে। আমি কাঁদি না। আমার ছেলে মানুষ হতে যাবে। মা হয়ে আমি কী কাঁদতে পারি?

বাবুন আমার হাতে হাত রাখে। যেন বহুদুর থেকে একটা ভালোবাসার কণ্ঠ ভেসে আসে।
- মা।

All comments are screened for appropriateness. Commenting is a privilege, not a right. Good comments will be cherished, bad comments will be deleted.