ক্লাস টেনে আমার নতুন বন্ধু হল। সাইকেল।
প্রথম প্রথম আমার সাইকেল ভ্রমন আমাদের আবাসিক এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল। বিকেলে সব ছেলেরা যখন ক্রিকেট খেলে আমি তখন সাইকেলে চড়ে- পুরো আবাসিক এলাকা চক্কর দিই- আর মেয়ে দেখতে থাকি। ছোট- বড়- মাঝারি সব টাইপের মেয়ে আমার দৃষ্টি সীমার মাঝে বিরাজ করতে থাকে।
এলাকার ফাহিম ভাই আমার চেয়ে দশ-ধাপ এগিয়ে। প্রত্যেক বিকেল বেলায় দেখা যায়- আবাসিক এলাকার মাঠে ফাহিম ভাই গীটার বাজিয়ে গান গাচ্ছেন আর তাকে বিন্দু বানিয়ে ছোট-বড়- মাঝারি রকমের মেয়েরা বসে আছে এবং গানের ফাঁকে ফাঁকে ন্যাকা ন্যাকা কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে।
- ভাইয়া…ঐ গানটা করেন না!
- ভাইয়া…আপনার গলা এত সুইট!
আমি এই দৃশ্য দেখে বিরাট কিছু দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করি এবং সাইকেল নিয়ে আবার মেয়ে দেখতে বেরিয়ে পড়ি।
এমনই এক সাইকেল চড়া বিকেলে অবন্তী’র সাথে আমার দেখা হলো। আবাসিক এলাকা’র বি ব্লকে ছিল ”চিটাগাং রেসিডেন্সিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ”এর মেয়েদের হোস্টেল। সেদিন বিকেলে সাইকেলে হেলান দিয়ে হোস্টেলের ভেতরে দেখার চেষ্টা করছি। হঠাৎ গেটের ভেতর থেকে একটা মেয়ে আমাকে ডাক দিল।
- ভাইয়া।
যতই মেয়ে মেয়ে করি- অপরিচিত একটা মেয়ের সাথে কথা বলতে গেলে আমার গলা শুকিয়ে যায়। কাঁপা কাঁপা বুক নিয়ে মেয়েটার দিকে তাকালাম। বয়সে আমার থেকে দুই-এক বছরে ছোট হবে। ডিমের মত লম্বাটে একটা মুখ। চাঁদের আলোর সর মাখা মুখটার মাঝে চোখ দুটি জ্বোনাকীর মত জ্বল জ্বল করছে। আমি বললাম।
- আমাকে বলছ?
- হুঁ।
- কী?
- একটা কাজ করে দিতে পারবা? তিন গোয়েন্দার নতুন বই বেরিয়েছে। কিনে এনে দিতে পারবা?
- কেন? তুমি কিনতে পার না?
- বই কিনতে হলে মোড়ে যেতে হবে। আমি অতদূর যেতে পারব? গেট থেকে বের হলেই ম্যাডাম খবর করে দেয়!
- আচ্ছা নিয়ে আসব।
মেয়েটার মুখ আনন্দে ভরে উঠল। সামান্য একটা কারণে মানুষ এত খুশি হতে পারে- আমার জানা ছিল না। মেয়েটা গেটের ভেতর থেকে হাত বাড়িয়ে দিল।
- এই নাও টাকা।
মুখে একটা গাম্ভীর্য এনে বললাম।
- টাকা লাগবে না।
- কেন? টাকা লাগবে না কেন?
- এমনি। বন্ধুর জন্য একটা বই কিনতে টাকা লাগবে নাকি?
মেয়েটা হি হি করে হেসে দিল।
- বন্ধু মানে? আমি তোমার বন্ধু হলাম কবে?
- এমনি বললাম। আচ্ছা বই নিয়ে আসব।
বলেই আমি সাইকেলে রওনা দিলাম। মেয়েটা পেছন থেকে আমাকে ডাকছে।
- এই ভাইয়া। টাকা নিয়ে যাও।
লাইব্রেরিতে বই কিনতে গিয়ে একটা কথা মনে পড়ল। আমার পকেটে সব মিলিয়ে দশ-পনের টাকার মত আছে। মনটাই খারাপ হয়ে গেল। পনের টাকা দিয়ে তো আর তিন গোয়েন্দার বইটা পাওয়া যাবে না। মেয়েটা নিশ্চয়ই গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে- বইটার জন্য।
পরেরদিন স্কুলের টিফিনের দশ টাকা আর আগের পনের টাকা মিলিয়ে বইটা কিনলাম। কী মনে করে- বইয়ের প্রথম পাতায় একটা লাইন লিখে দিলাম।
”তুই কী আমার বন্ধু হবি?”
বিকেলে হোস্টেলের সামনে গিয়ে দেখি মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে। আমি বললাম।
- গেটের বাইরে যে। ম্যাডাম বকবে না?
- জানি না। বই দাও।
আমি মেয়েটাকে বই দিলাম। বই হাতে নিয়েই সে বলল।
- এখন যাই…ভাইয়া? এক্ষুণি পড়া শেষ করে ফেলব।
আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই ও চলে গেল। আমার মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল। মেয়েরা শালা এত স্বার্থপর হয়! ঐ লাইনটা কেন লিখলাম- সেটা চিন্তা করে লজ্জা লাগতে লাগল।
এবং পরেরদিন আমি আবার হোস্টলের সামনে গেলাম। অবাক হয়ে দেখলাম মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা বই। আমাকে দেখার সাথে সাথে বলল।
- এত লেট করলে কেন? কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি।
ওর কথা শুনে মনে হল- আমি প্রত্যেকদিন বিকেল ঠিক চারটায় এখানে আসি। আর মেয়েটা আমার আসার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে।
- না। এমনি।
- তুমি শুধু ‘এমনি’ ‘এমনি’ কর কেন? আমার খুব মজা লাগে। ও… এই নাও।
আমার দিকে ও হাতের বইটা বাড়িয়ে দিল।
- কী এটা?
- গিফট। তবে পুরনো। পুরনো বই গিফট দিয়েছি দেখে আবার রাগ করে বসে থেকো না।
- না… শুধু শুধু রাগ করব কেন?
রাতে বইটা খুলে দেখি- প্রথম পাতায় গুটি গুটি অক্ষরে লেখা।
”যাও… আমি তোমার বন্ধু হলাম।
- অবন্তী”
এরপর প্রত্যেক বিকেলে অবন্তী’র সাথে আমার দেখা হতে লাগল। সাইকেলে চড়ে মেয়ে দেখা বাদ দিয়ে দিলাম। গেটের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমরা গল্প করি। আমি অবন্তীকে জিজ্ঞেস করি-
- তুমি গেটের বাইরে এসে আমার সাথে গল্প কর। কেউ কিছু বলে না?
আদ্ভুত মিষ্টি একটা পরিবেশ চারদিকে সৃষ্টি করে অবন্তী বলে।
- না… বিকেল তো! আর আমাদের দারোয়ান ভাই খুব ভালো। ম্যাডামকে বলবে না।
একদিন অবন্তী আমাকে বলল-
- আমার খুব সাইকেলে চড়তে ইচ্ছে করছে!
- তুমি সাইকেল চালাতে পারো?
- উঁহু।
- তাইলে? কীভাবে চড়বা?
- কেন… তুমি চালাবা। আমি বসে থাকব।
- কেউ যদি দ্যাখে?
- দেখলে দেখুক।
আমি সাইকেল চালাই। অবন্তী আমার সামনে বসে থাকে। ও’র চুলগুলো আমার চোখে এসে লাগে। হঠাৎ হঠাৎ অবন্তী বলে ওঠে।
- এই! আস্তে চালাও। পড়ে যাব তো!
পৃথিবীটা আমার কাছে অসম্ভব রকমের সুন্দর মনে হয়। এরপর ঘটনাটা নিয়মিত ঘটতে লাগল।
একদিন বিকেলে অবন্তী আসল না। আমি সন্ধ্যে ছয়টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকলাম। অবাক হয়ে খেয়াল করলাম- আমার চোখ দুটি ভিজে উঠেছে।
আমি আমার জীবনে-একটা মেয়ে কিংবা একটা মানুষের মুখ দেখার জন্য প্রথম কাঁদলাম।
এর পরের দিনও অবন্তী এলো না… পরের দিনও না… পরের দিনও না। আমি সকল লজ্জা বিসর্জন দিয়ে এক মেয়েকে জিজ্ঞেস করলাম।
- অবন্তীকে দেখেছ?
মেয়েটা রহস্যময় দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো।
- আপনি কে?
- আমি ওর ভাই।
- ভাই? অবন্তী’র বাবা মারা গেছে। ও তো কুমিল্লায়। আপনি এখানে কী করছেন?
একদিন অবন্তী এল। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে অবন্তীদের হোস্টেলের সামনে গিয়ে দেখি- জ্বোনাকীর মত জ্বল জ্বল চোখ নিয়ে অবন্তী দাঁড়িয়ে আছে। শুধু জ্বোনাকী দুটো বৃষ্টিতে ভেজা। আমাকে দেখেই অবন্তী আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। মেয়েটা পাগলের মত কাঁদছে আর বলছে…
- ভাইয়া।
আমি অবন্তী’র চুলে হাত রেখে বললাম।
- আমি তোকে ভালোবাসি।
মানুষ যাকে ভালোবাসে- সে যখন বুকের মধ্যে মাথা রেখে কাঁদে তখন কেমন লাগে অবন্তী সেটা জানে না?
ঐ বছর শেষেই অবন্তী রেসিডেন্সিয়াল স্কুল থেকে চলে গিয়েছিল। ওর মা’র পক্ষে খরচ বহন করা সম্ভব না। অবন্তী কুমিল্লায়- ওদের গ্রামের বাড়িতে চলে যাবে। সেখানেই পড়াশোনা করবে।
শেষ দেখার বিকেলে আমি আর অবন্তী সাইকেলে চড়ে আবাসিক এলাকার সীমানা পেরিয়েছিলাম। সাইকেলের হাতলে রাখা- আমার হাতের ওপর হাত রেখে অবন্তী আমাকে বলেছিল।
- ভাইয়া। এটাই বোধহয় আমার শেষ সাইকেলে চড়া।