bokashoka

প্রিন্সেস! ঘুমিয়ে পড়েছিস?

In Uncategorized on মার্চ 15, 2008 at 1:17 অপরাহ্ন


- আব্বু। স্কুলের টিচাররা আমাকে বকা দিবে?
আমি কোটি কোটি মায়া নিয়ে পাগলটার দিকে তাকালাম। এমনিতে আমার মুখ-খানা কুৎসিত। শুধু সাবা’র দিকে যখন তাকাই- অজস্র মমতা আমার চোখদুটিতে ভর করে। আমার মনে হয়, এই পৃথিবীতে- চোখে এমন মমতা নিয়ে কেউ কারো দিকে তাকায় না। কিংবা তাকাতে পারে না। সাবা আমার মেয়ে। আগামী সপ্তাহ থেকে সে স্কুলে যাবে। এ নিয়ে রাজকন্যা’র চিন্তার শেষ নেই। আমি অফিস থেকে ফেরার পর থেকেই কোলের ওপর বসে আছে। আর ঘুম ঘুম চোখে নানান রকম প্রশ্ন করছে। ” আব্বু, অংক খুব কঠিন?” ”আব্বু, স্কুলে আমার অনেক বন্ধু হবে। তাই না?”
আমি সাবা’র ছোট্ট নাকটা টিপে দিই। আর বলি-
- তুই হলি গিয়ে প্রিন্সেস। প্রিন্সেসকে কি কেউ বকা দেয় কোনদিন?
- প্রিন্সেস ডায়ানা।
বলে সে খিল খিল করে হাসে। সত্যিকারের প্রিন্সেসরা এমন সুন্দর করে হাসতে পারে? আমার বিশ্বাস হয় না।
এই মুহুর্তে আমি আর সাবা মিলে টিভি দেখছি। রাজনৈতিক নেতাদের ‘আড্ডা’ টাইপ একটা অনুষ্ঠান। প্রিন্সেস খুব মনোযোগ দিয়ে টিভি’র দিকে তাকিয়ে আছে। কী বুঝছে? কে জানে? একটু পরে আমি, সাবা আর আমার স্ত্রী ইতি বাইরে খেতে যাব। এমন দিনে নিজেকে খুব বেশি সুখী মনে হয়। মনে হয় না, দামী আইস্ক্রীম খাওয়াতে পারি না বলে সাবা ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদে- কিংবা একটা ফ্রীজ কেনার জন্য ইতি দুই সপ্তাহ আমার সাথে কথা বলে না। ইতি সাবা’র পাশে এসে বসল। দুই রাজকন্যাকে নিয়ে বসে আছি। কে বলবে আমি দুঃখী মানুষ?

ইতি’র সাথে আমার পরিচয় ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে। স্পষ্ট মনে আছে, আমাদের প্রায় কথা হত বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে। আমি বলতাম আমাদের মেয়ে হবে। মেয়ের নাম ঠিক করতাম। আর ইতি বলত ছেলের কথা।
ইন্টার পরীক্ষার পরে ইতিকে বিয়ে করলাম। বিয়ে করেই আব্বুকে ফোন করলাম।
- আব্বু। একটা দুঃসংবাদ আছে।
আব্বু কোন কথাকেই সিরিয়াসলি নিত না। আমাকে বলল
- কি? বুড্ডা।
আব্বু আমাকে বুড্ডা বলে ডাকত।
- আমি একটা মেয়েকে বিয়ে করে ফেলছি।
- হুম। বিয়ে তো একটা মেয়েকেই করবি। তাই না? কোন ছেলেকে নিশ্চয় বুড্ডা বিয়ে করবে না।
- আব্বু। আমি সিরিয়াস।
- হুম। আমাকে কি করতে হবে?
- আব্বু। আমি সিরিয়াস আর sorry। আম্মুকে একটু ম্যানেজ কর না।
এরপর ইতি’কে বাসায় নিয়ে আসলাম। আম্মু কিছু বলল না। আব্বু ইতি’র সঙ্গে কোন কথা বলল না। আমি খুব অবাক হলাম। আব্বু তো এমন না। এরপর প্রায় একবছর আব্বু ইতি’র সঙ্গে কথা বলে নি। শুধু মৃত্যুর সময় ইতি’র হাত ধরে অনেক কাঁদল।
- মা। তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। আমাকে মাফ করে দিও, মা।

আব্বু মারা যাওয়ার কয়েক মাস পরেই ইতি’র সাথে খেলায় জিতলাম। ইতি’র কোলে একটা প্রিন্সেস এল। নাম রাখলাম সাবা।

সাবা’র স্কুলে প্রথম দিন আমরা তিনজনই গেলাম। মোটর সাইকেলে’র সামনে সাবা- মাঝখানে আমি- পেছনে ইতি। আমার মনে হচ্ছিল- মায়া আর ভালোবাসার বাঁধনে আমি মারাই যাব। স্কুলে গেটের কাছে গিয়েই সাবা কান্না শুরু করল।
- আব্বু। আমার ভয় লাগছে।
- গাধা। ভয় কীসের?
- টিচাররা আমাকে যদি মারে?
- বললেই হল। আমার মেয়েকে মারার সাহস আছে কারো?
ইতি সাবা’কে কোলে নিল। পৃথিবীর সব থেকে মধুর দৃশ্য। মায়ের কোলে শিশু। আমি বুকভর্তি সাহস নিয়ে সাবা আর ইতির জন্য দুইটা চকবার আইস্ক্রীম কিনে ফেললাম। সামান্য কয়েকটা টাকার জন্য আমি আমার ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারব না? ইতি বলল।
- তুমি খাবা না?
- আমি আইস্ক্রীম খাই না।
- তাইলে আমিও খাই না।
হঠাৎ করে সাবা কান্নাভেজা কন্ঠে বলে উঠল।
- তাইলে আমিও খাই না।
আমরা তিনজনই হেসে উঠলাম। বোধহয়- আকাশটাও।

অফিসে গিয়েই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। কি ফাইল নাকি হারিয়ে গেছে। দোষটাও নাকি আমার। অথচ ফাইলটা সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্য জিনিস। শ্রেণী বৈষম্য। ফাইলের জন্য সমস্ত অফিস খোঁজাখুঁজি করছি। বারোটা’র দিকে ইতি ফোন করল।
- সাবাকে আনতে যাবা না?
আমি অনেক কষ্টে নিজেকে সামলিয়ে নিলাম। মেয়েমানুষের বুদ্ধিশুদ্ধি এত কম?
- একটু সমস্যায় আছি। তাছাড়া যখন ইচ্ছা তখন তো অফিস থেকে চলে যেতে পারি না। আমি তো আর অফিসের বস না। কর্মচারী।
- প্লীজ আসো না। আজ সাবা’র স্কুলে ফার্স্ট দিন। একটা প্ল্যান আছে আমার। কিছু জমানো টাকা আছে। আজকে তোমাদেরকে লাঞ্চ করাব।
- ন্যাকামি রাখো তো।
কথাটা বলার সাথে সাথেই ইতি ফোন কেটে দিল। মনটা কিছুটা খারাপ হল। ইতি’র সঙ্গে অনেকদিন পর খারাপ ব্যবহার করলাম।

তিনটার দিকে বাড়ি ফিরলাম। দেখি দরজায় তালা লাগানো। পাশের বাড়ির জয়নাল সাহেব আমার দিকে ছুটে আসল।
- আরে সোহান। তুমি কই ছিলা?
জয়নাল সাহেবের মুখ দেখেই আমার বুক ধ্বক করে উঠল। ইতি আর সাবার কিছু হয় নি তো?
- কি হয়েছে? আংকেল?
- তুমি এক্ষণি ‘রাজমণি ক্লিনিকে চলে যাও। তোমার বউ-বাচ্চা একসিডেন্ট করছে।
আমার পৃথিবী কাঁপতে লাগল। পাগলের মত ছুটলাম। আমার মনে হচ্ছিল আমার পাপের কোন প্রায়শ্চিত্ত নেই।

উপসংহারঃ

একটা ট্রাক ওদের রিকশায় ধাক্কা মেরেছিল। সাবা সাথেই সাথেই মারা যায়। আমি কেন ওকে স্কুল থেকে আনতে যাই নি- সেটা বলে কাঁদছিল তখন। আর বলছিল আমার সাথে আর কখনো কথা বলবে না- আমার সাথে আড়ি নিবে। এসব কথা আমাকে বলেছে ইতি। তিনদিন পর রাজমণি ক্লিনিকেই ইতি মারা যায়।

আমার এখনো মনে হয়- ওরা ফিরে আসবে। আমরা তিনজন বিকেল বেলা বুড়িগঙ্গার তীরে বসে থাকব। ইতি আমার গান শুনতে চাইবে। আর সাবা ছুটাছুটি করবে।
এখনো গভীর রাতে আমি বালিশে মুখ চেপে ধরি। আর সাবা’কে বলি।
- প্রিন্সেস! ঘুমিয়ে পড়েছিস?

[সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশে এখন একটা নিয়মিত ঘটনা। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই এসব সংবাদ চোখে পড়ে। মানব জীবন খুবই সীমিত। এ ধরণের ঘটনা যখন সীমিত জীবন আরো সংক্ষিপ্ত করে দেয়- তখন স্বভাবতই মন ভারী হয়ে আসে।
এর বিচার আমরা কার কাছে চাইব?]

  1. 01714104853, call me any one from Sylhet i need friend in Sylhet

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.